
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক সামষ্টিক ভোজ ও দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) রাত ১০টায় হলের ডাইনিং কক্ষে এ সামষ্টিক ভোজের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্র অধিকার বিষয়ক সম্পাদক মহিবুর রহমান মুহিব। এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন জাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান এবং জাবি শাখা শিবিরের নেতা ফেরদৌস আল হাসান, শাফায়েত মীর, শফিউজ্জামান শাহীন, রাকিবুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদসহ অনেকে।
আয়োজনে অংশ নিয়ে নবীন শিক্ষার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা জানতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে গণরুম ও গেস্টরুমের মতো নির্যাতনমূলক কালচার প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে এখন আমরা সম্পূর্ণ উল্টো ও ইতিবাচক চিত্র দেখছি। নবীনদের বরণ করে নেওয়ার এই সুন্দর আয়োজনের জন্য ছাত্রশিবিরকে ধন্যবাদ।”
অনুষ্ঠানে নবীনদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মহিবুর রহমান মুহিব বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সঠিক নির্দেশনার অভাবে প্রথম ২-৩ মাসের মধ্যেই অনেকে ভুল পথে পা বাড়ায়, এমনকি কেউ কেউ বহিষ্কৃতও হয়। ক্যাম্পাসে আপনাদের সামনেও নানা রকম নেতিবাচক ফাঁদ আসবে। আপনাদেরকে সেই ফাঁদগুলো চিহ্নিত করে ছাত্রত্ব বজায় রাখতে হবে এবং সচেতন থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ইসলামী ছাত্রশিবির মূলত সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে একটি আদর্শ নাগরিক সমাজ তৈরি করতে চায়। আমাদের দেশে দক্ষ মানুষের অভাব নেই, আবার সৎ মানুষেরও অভাব নেই। কিন্তু সমস্যা হলো—সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের এই ত্রিমাত্রিক সমন্বয়ের বড় অভাব। আমরা দেখি, অনেকে অনেক বেশি দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও দেশপ্রেমের অভাবে বালিশ কাণ্ড, পর্দা কাণ্ড কিংবা ছাগল কাণ্ডের মতো দুর্নীতি ঘটাচ্ছেন; যা দেশের বড় বড় আমলারা করছেন। আবার অনেকে সৎ হলেও দক্ষতার অভাবে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ছাত্রশিবির চায় এমন একদল মানুষ তৈরি করতে, যাদের মধ্যে সততা ও দক্ষতা যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা।”
শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির যখনই আপনাদের কাছে কোনো ভালো আহ্বান নিয়ে আসবে, আপনারা তা গ্রহণ করবেন। আর যদি আমাদের কোনো কাজ আপনাদের কাছে নেতিবাচক মনে হয়, তবে নির্দ্বিধায় তা ধরিয়ে দেবেন। একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠনের কাছ থেকে আপনারা যা প্রত্যাশা করেন, তা আমাদের জানাবেন। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা শিক্ষার পরিবেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে চাই।”
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে মুহিব বলেন, “মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। ইবাদত শুধু মাদ্রাসা বা মসজিদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। আপনি ফার্মেসি, রসায়ন কিংবা ইতিহাসে যে বিষয়েই পড়ুন না কেন, যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে এই শিক্ষার মাধ্যমে দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণ করা এবং তা যদি আল্লাহর রাসুলের (সা.) নির্দেশিত পন্থায় হয়, তবে আপনার এই পড়াশোনাটাই ইবাদতে পরিণত হবে।”
সবশেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আজকের নবীন শিক্ষার্থীরা আগামী পাঁচ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের আলো নিয়ে দেশ ও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বেন এবং সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবেন।
শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতীতে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হতো। কাউকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত করার চেষ্টা করা হতো, আবার কেউ কেউ মাদকাসক্তির দিকেও ঠেলে দেওয়া হতো। তবে বর্তমানে ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের জন্য একটি তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সবাই নিজ নিজ কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারছে।
তিনি বলেন, “আমাদের সব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের জন্য। ইসলামী ছাত্রশিবির শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চায় না; বরং তাদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করতে চায়। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নেতা নয়, বরং আপনাদের বড় ভাই হিসেবে ভাববেন। আমরা আপনাদের উপকারের জন্য রাজনীতি করি। যদি কখনো মনে হয় আমাদের কোনো কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে, তাহলে আমাদের কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানাবেন।”
ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, পৃথিবীর সব ধর্মই মানুষকে সত্যবাদিতা, নৈতিকতা ও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ ধর্মের নৈতিক শিক্ষা অনুসরণ করা। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। তাই এখান থেকে শুধু দক্ষ নয়, নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। নৈতিকতার অভাব হলে দক্ষ ব্যক্তিরাও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ছাত্রশিবির শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিক জীবন গঠন, ভালো কাজে অংশগ্রহণ এবং অন্যায় ও অসৎ কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি বলেন, কোনো ছাত্রসংগঠনকে অন্ধ সমর্থন নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে যৌক্তিক ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভালো কাজের প্রশংসা এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করা উচিত।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি ক্যাম্পাসে গণরুম, গেস্টরুম, র্যাগিং ও মাদক সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একটি নিরাপদ, মাদকমুক্ত ও সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন