
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস ব্যবসায়ী আজিজ খলিফা (৫৩) অপহরণ ও হত্যা মামলার প্রধান এজাহারভুক্ত আসামি, মূল পরিকল্পনাকারী উদয়ন ধর (৪০)-কে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানার চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গহীন জঙ্গল থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে সহকারী পুলিশ সুপার, সহকারী পরিচালক (ল এন্ড মিডিয়া) আ.ম.ফারুক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
প্রেস বার্তায় জানানো হয়, গত ৮ই জুন, রাত ৯:১০ এর দিকে র্যাব-১৫, কক্সবাজার এবং র্যাব-৭, চট্টগ্রাম (CPC-3)-এর একটি চৌকস আভিযানিক দল যৌথ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
প্রসঙ্গত গত ২০ মে, ভিকটিম আজিজ খলিফা তাঁর পাওনা ৬ লক্ষ টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে নাইক্ষ্যংছড়ির উত্তর বাইশারী স্থানীয় বাজারে ১নং আসামি উদয়ন ধরের কাপড়ের দোকানে যান। আসামি উদয়ন ধর টাকা না দিয়ে উল্টো ভিকটিমকে কৌশলে ১,০০০ টাকা পথ খরচ দিয়ে কক্সবাজারের সিআইসি (CIC) হাসপাতালে তাঁর পরিচিত একজন ডাক্তারের কাছে পাঠায়।
ভিকটিম সিআইসি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর (দুপুরের দিকে) পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওৎ পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন অপরাধী তাকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। ভিকটিমকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার উদ্দেশ্যে আসামিরা তাঁর ওপর মারাত্মক শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন চালায়।
চরম নির্যাতনের মুখেও ভিকটিম কৌশলে আসামিদের নজর এড়িয়ে তাঁর নিজের ইমু (Imo) অ্যাকাউন্ট থেকে সন্ধ্যা ৬:৩৬ ঘটিকায় মামলার ২নং সাক্ষীর মোবাইলে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান।
এরপর ২০ মে রাত ৮:৩০ এর দিকে ঈদগাহ থানার কালিরছড়া রেললাইনের পাশ থেকে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ভিকটিমকে হাত-পা বাঁধা এবং রক্তাক্ত মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় ঈদগাহ মডেল হাসপাতাল ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভিকটিমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
গত ২১ মে চমেক হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি না থাকায় তাকে বেসরকারি ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল’-এর আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসার চড়া খরচ বহনে অসমর্থ হয়ে ২২ মে পরিবার ভিকটিমকে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং গত ২৩ মে, ২০২৬ তারিখ সকালে নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভিকটিম আজিজ খলিফা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খবর পেয়ে বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ এসে লাশের সুরতহাল (Inquest) রিপোর্ট প্রস্তুত করে।
ভিকটিমের মৃত্যুর পর অপরাধ ধামাচাপা দিতে আসামিপক্ষ ২নং বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের ০৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল কবিরের মাধ্যমে বিষয়টি সামাজিক আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা করে এবং আইনি পদক্ষেপ না নিতে বাদীপক্ষকে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
বিষয়টি নজরে আসার পরপরই র্যাব-১৫ এই হত্যাকাণ্ডের ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং দেশব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে। এরই মাঝে ২৫ মে, ২০২৬ তারিখে ভিকটিমের ২য় স্ত্রী সেলিনা আকতার বেবী নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেন, মামলা রুজু হওয়ার খবর পেয়ে ১নং আসামি ও মূল পরিকল্পনাকারী উদয়ন ধর এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তীতে র্যাব-১৫ এর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আসামি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে আত্মগোপন করে আছে।
তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর গত ৮ জুন, ২০২৬ তারিখ রাত ১০:১০ এর দিকে র্যাব-১৫, কক্সবাজার এবং র্যাব-৭, চট্টগ্রাম-এর আভিযানিক দল চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে মূলহোতা উদয়ন ধরকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত আসামী উদয়ন ধর (৪০) বান্দরবান জেলার নাইক্ষংছড়ি উপজেলার ২নং বাইশারী ইউনিয়নের উত্তর বাইশারী ৭নং ওয়ার্ড কাংগাইশিয়া এলাকার মৃত বজেন্দ্র ধর এর পুত্র। গ্রেফতার পরবর্তী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসামিকে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন