
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশে এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। উপকূলের লবণাক্ততা, নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড় ও জীবিকার সংকট ইতোমধ্যেই লাখো মানুষের জীবনের বাস্তবতা। তবে যে প্রজন্ম দীর্ঘ সময় ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহন করবে, নীতিনির্ধারণের টেবিলে সেই তরুণদের কণ্ঠ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—এখন সামনে এসেছে সেই প্রশ্ন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২৬ এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। চার দিনের এই আয়োজনে দেশের ৬৪ জেলার তরুণদের অভিজ্ঞতা ও মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে জাতীয় ইউথ ক্লাইমেট পজিশন পেপার ২০২৬। একই সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে ২০ দফা ইয়ুথ ক্লাইমেট রাইটস চার্টার।
চার্টারে জলবায়ু অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু শিক্ষা, লিঙ্গসমতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নীতিনির্ধারণে তরুণদের অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
অংশগ্রহণ আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ কি এক?
তরুণরা কথা বললেই কি নীতি বদলায়—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
দেশে তরুণদের অংশগ্রহণ নিয়ে নিয়মিত সম্মেলন, আলোচনা ও বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা গেলেও অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ এক বিষয় নয়। কোনো তরুণকে আলোচনার মঞ্চে বসানো এবং তার মতামতকে সরকারি পরিকল্পনা, বাজেট কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে রয়েছে বড় পার্থক্য।
বাংলাদেশ ইয়ুথ কপের অবস্থানপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মাঠভিত্তিক অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এতে উঠে এসেছে।
নোয়াখালীর হাতিয়ার এক তরুণ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঝড় ও জলাবদ্ধতার কারণে দ্বীপাঞ্চলের মানুষ অনেক সময় যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে স্পষ্ট হয়, জলবায়ু নীতি শুধু বড় প্রকল্প কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, যাতায়াত, স্বাস্থ্য ও জীবিকার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রতীকী অংশগ্রহণ নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ
বাংলাদেশের জলবায়ু নীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণকে প্রতীকী পর্যায় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তরুণদের জন্য নিয়মিত পরামর্শ কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। জলবায়ু প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় তরুণ, নারী, কৃষক, জেলে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে তরুণদের জলবায়ু-উদ্ভাবন, গবেষণা এবং স্থানীয় অভিযোজন উদ্যোগে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
জলবায়ু অর্থায়নে নজরদারি
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা উপকৃত হচ্ছে এবং প্রকল্পগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে—এসব বিষয়েও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে তরুণদের গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, সামাজিক নজরদারি ও স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হলে জলবায়ু প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে।
এখন দায়িত্ব তরুণদেরও
ইয়ুথ কপ ২০২৬-এর তরুণরা তাদের দাবি ও প্রত্যাশা নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরেছেন। এখন সেই দাবিকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তরুণদেরও।
শুধু দাবি জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তথ্য, গবেষণা, স্থানীয় উদ্যোগ এবং বাস্তবসম্মত নীতিগত প্রস্তাব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদেরও তরুণদের মতামতকে কেবল পরামর্শ হিসেবে না দেখে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার বহন করবে আজকের তরুণ প্রজন্ম। তাই তাদের কণ্ঠ শোনা কোনো সৌজন্য নয়; বরং জলবায়ু নীতিকে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু—বাংলাদেশের তরুণরা কী বলছে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—তাদের কথাগুলো নীতি, বাজেট, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?
সম্মেলনের মঞ্চে তরুণদের কণ্ঠ শোনা যথেষ্ট নয়। সেই কণ্ঠ যদি বাজেট, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তবেই তরুণ নেতৃত্ব বাংলাদেশের জলবায়ু নীতিতে অর্থবহ পরিবর্তনের অংশীদার হতে পারবে।
মন্তব্য করুন