এলিন মাহবুব, কলামিস্ট (প্রেস ডেস্ক বিডি)
৪ মার্চ ২০২৬, ৮:১২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

১৯৫৩: এক গোপন অভ্যুত্থানের ছায়ায় বদলে যাওয়া ইরানের ভাগ্য

১৯৫৩: এক গোপন অভ্যুত্থানের ছায়ায় বদলে যাওয়া ইরানের ভাগ্য
১৯৫৩: এক গোপন অভ্যুত্থানের ছায়ায় বদলে যাওয়া ইরানের ভাগ্য

Share this news with

ইতিহাসের কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায় না—একটি জাতির মানস গঠনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। ১৯৫৩ সালের ইরানের গোপন অভ্যুত্থান সেই ধরনের এক সন্ধিক্ষণ। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ  মোসাদ্দেককে অপসারণ করে রাজতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার যে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা কেবল ক্ষমতার রদবদল ছিল না; এটি ছিল সার্বভৌমত্ব, সম্পদ-নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রভাব-রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ।

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ইরানের তেলসম্পদ বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ছিল। মোসাদ্দেক ক্ষমতায় এসে তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন। এই পদক্ষেপ ইরানের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। কিন্তু শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা শক্তিগুলো এটিকে কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেনি; বরং এটি ছিল প্রভাব-অঞ্চল রক্ষার প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি  এবং যুক্তরাজ্যের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস  গোপনে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি, প্রচারযুদ্ধ এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের কৌশল নেয়। ১৯ আগস্ট ১৯৫৩–তে সেই পরিকল্পনা সফল হয় এবং মোঃ রেজা শাহ পাহলভী   পুনরায় পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরে আসেন।

গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়,অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ইরানে আপাতত স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়। নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার হয়, ভিন্নমত দমনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নাগরিক আস্থার সংকট গভীরতর হয়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে বাহ্যিক শক্তির সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত স্থিতি কি টেকসই হয়?ইরানের ক্ষেত্রে উত্তরটি ছিল না। কারণ রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি ছিল দুর্বল। এই সঞ্চিত ক্ষোভ ও অবিশ্বাস ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামী বিপ্লবের  পথ প্রস্তুত করে।

ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি মূলত ১৯৫৩ সালের ক্যু বা অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট গভীর ঐতিহাসিক ক্ষতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে ‘ঐতিহাসিক স্মৃতির রাজনীতি’ হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনাটি ইরানি রাষ্ট্রচিন্তায় বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি চিরস্থায়ী সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে, যার ফলে দেশটি তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো প্রকার ছাড় না দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকেই ইরানের মাঝে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতি চরম কূটনৈতিক অবিশ্বাস এবং যেকোনো মূল্যে অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বনির্ভরতা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। সংক্ষেপে, ১৯৫৩ সালের স্মৃতি ইরানকে একটি ‘প্রতিরোধমূলক মনস্তত্ত্বের’ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, যেখানে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় হস্তক্ষেপকে ন্যায্য মনে করে। কিন্তু উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যাঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

ইরানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করলে দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয়তাবাদকে তীব্র করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অবিশ্বাসের চক্রে আবদ্ধ করে।

১৯৫৩ সালের ইরানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রধান শিক্ষণীয় দিক হলো—জাতীয় সংহতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নিবিড় সংযোগ। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত করতে কেবল আবেগী জাতীয়তাবাদ যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, যা বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের পথ বন্ধ করে দেয়। ইরানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকলে তা বহিরাগত শক্তির জন্য ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সার্বভৌম সুরক্ষা—উভয়ই রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি মুক্ত থাকে।

১৯৫৩ সালের ইরানের গোপন অভ্যুত্থান ছিল একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথে মোড় ঘোরানো ঘটনা। এটি আমাদের শেখায়—রাষ্ট্রের বৈধতা কেবল শক্তির ওপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের ওপর।

আজকের ইরানকে বুঝতে হলে ১৯৫৩–কে বুঝতে হবে। কারণ ইতিহাস কখনো নিঃশেষ হয় না; তা রাষ্ট্রের নীতিতে, নাগরিকের মানসে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষ্যে পুনরায় উপস্থিত হয়।

এই ক্ষেত্রে আমার মূল্যায়ন হলো—যে রাষ্ট্র তার ঐতিহাসিক ক্ষতকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির মাধ্যমে রূপান্তর করতে পারে, কেবল সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে সক্ষম।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাবির আন্তঃবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্টে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে লোক প্রশাসন বিভাগ

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী প্রচারযাত্রা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা

১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক: ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের ঘোষণা

সাময়িকভাবে বাতিল হওয়া বাংলা এডিশনের নিবন্ধন পুনর্বহাল

৬ দফা দাবিতে খামারবাড়িতে আউটসোর্সিং গাড়িচালকদের অবস্থান

রংপুরে একই পরিবারের ৪ জন হত্যায় দুই যুবক গ্রেপ্তার

হাতিয়ায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, জামায়াত কর্মী গ্রেপ্তার

বগুড়ায় স্কুলের জায়গা দখল, একমাত্র ভরসা টিনের ঘর

ধুনটে গৃহবধূকে মারধর ও হাসুয়া দিয়ে কোপের অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ

১০

ধুনটে ২০২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০৩টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক, ভারপ্রাপ্তের চাপে বিপর্যস্ত পাঠদান

১১

শিল্পকলায় বসছে দুই দিনের পুতুলনাট্য উৎসব, শুরু ২৭ আগস্ট

১২

দৌলতপুরে ১৪ বোতল নিষিদ্ধ এসকাফ সহ যুবক আটক

১৩

কুবির আইসিটি এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে মেহেদী-শফিউল

১৪

‎নোয়াখালীতে মুখোশধারীদের এলোপাতাড়ি গুলি, শিক্ষকসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ

১৫

ঢাকায় আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুছ

১৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কালো দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

১৭

গোবিপ্রবিতে ক্লেমনের উদ্যোগে দিনব্যাপী এক হাজার বৃক্ষরোপণ

১৮

চাকরিচ্যুতির আদেশ বাতিল ও পূর্ণবহালের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ভিকটিম পুলিশ পরিবারের অবস্থান

১৯

খিলগাঁওয়ের রয়েল এইড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড

২০