
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেতং খুমী পাড়ায় হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত ১৫ দিনে হামের উপসর্গে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার (২৭ জুলাই) উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে চার বছর বয়সী ফ্রেএং খুমীর মৃত্যু হয়। এর দুই দিন আগে একই পরিবারের সাত বছর বয়সী বড় ভাই প্রেটংএং খুমীও হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। একই পরিবারের দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ দিনে মারা যাওয়া সাত শিশু হলো— ফ্রেলে এ খুমী (৯), খ্রেপা খুমী (১৩), শইফ্রা খুমী (১৩), খ্রেতেম এং খুমী (৬), পলি এং খুমী (৭), প্রেটংএং খুমী (৭) ও ফ্রেএং খুমী (৪)। তারা সবাই রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লেতং খুমী পাড়ার বাসিন্দা।
স্থানীয় বাসিন্দা অংসাই খুমী জানান, মৃত শিশুদের অধিকাংশই একই পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়। দুজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নেওয়ার পথে, আর বাকিরা পাড়িতেই মারা গেছে। বর্তমানে হামের লক্ষণ দেখা দিলেই শিশুদের দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রায় ২৮টি খুমী পরিবারের বসবাস লেতং খুমী পাড়ায়। বগালেক থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, আবার অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন পাহাড়ি পাড়ায় ২০ থেকে ২৫ জনের বেশি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক হামের উপসর্গে ভুগছেন। অর্থাভাবে অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। কেউ কেউ ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছেন।
প্রায় প্রতিটি ঘরেই আক্রান্ত শিশু
ইউনিসেফের ভ্যাকসিনেটর কর্মী উথোয়াই সিং মারমা জানান, লেতং খুমী পাড়ার প্রায় প্রতিটি ঘরেই হামে আক্রান্ত শিশু রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকাদানের সময় গুরুতর অসুস্থ কয়েকজন শিশুকে হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও তাদের মধ্যে একজন হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায়।
প্রায় ১০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, চলতি বছরের ৬ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে ৬৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩ শিশু এবং বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে আরও ২৫ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. তৌহিদুল আনোয়ার জানান, চার বছর বয়সী ফ্রেএং খুমীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী ও ভ্যাকসিনেটর পাঠানো হয়েছে। খুমী ও ম্রো জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার এখনও নিয়মিত টিকা নেয় না। বাইরে থেকে গ্রামে ফেরা কয়েকজন শিশুর মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, এক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে টিকা কভারেজ কম এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় রোগীদের ভাড়া করা জিপে করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া ১০ শয্যার হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী চিকিৎসা নেওয়ায় অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী বলেন, দুর্গম এলাকায় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব শিশুর টিকাদান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
মন্তব্য করুন