
উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থান ঠাকুরগাঁওয়ের ‘পীরডাঙ্গী গোরস্থান’। প্রখ্যাত সাধক হযরত পীর সিরাজউদ্দিন আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এবং তাঁর নামেই যে উপজেলার নামকরণ—সেই পীরগঞ্জের এই প্রাচীন কবরস্থানটি এখন যেন এক ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে স্বয়ং পৌর কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন শহরের স্তূপীকৃত বর্জ্য এনে ফেলছে এই পবিত্র ভূমিতে, যা নিয়ে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কবরস্থানটির উত্তর পাশে পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ এবং দক্ষিণ পাশে সবুজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী ও পথচারীকে এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু দিনদুপুড়ে এখানে ময়লা-আবর্জনা ও মরা পশু ফেলার কারণে পুরো এলাকার বাতাস পচা দুর্গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। গত ঈদুল আজহার পশুর বর্জ্যও এখানেই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় মুসল্লিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুর্গন্ধের কারণে এখন স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে আসাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মৃত মানুষের প্রতি এমন চরম অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বিশাল এই গোরস্থানটি দীর্ঘদিন ধরেই চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে। চারদিকের মধ্যে মাত্র একদিকে নামমাত্র একটু বেড়া থাকলেও বাকি তিন দিকই সম্পূর্ণ অরক্ষিত। রাতে এখানে কোনো আলোর ব্যবস্থা থাকে না। ঘুটঘুটে এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কবরস্থানের ভেতরেই নিয়মিত বসছে মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডা, যা আশেপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার পরিবেশকে কলুষিত করছে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৫ ও ২৯৭ ধারা এবং দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক স্থানের পবিত্রতা নষ্ট করা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু খোদ স্থানীয় অভিভাবক সংস্থা বা পৌরসভা নিজেই এই আইন দিনের পর দিন লঙ্ঘন করে চলেছে।
এই অরক্ষিত অবস্থার কারণে এলাকাবাসীর মনে নতুন করে কঙ্কাল চুরির আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কারণ, বিগত ২০২২ সালের জুলাই মাসে এই পীরডাঙ্গী গোরস্থান থেকেই এক রাতে প্রায় ১৯টি কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছিল। এর ঠিক পরের বছর ২০২৩ সালের আগস্টে উপজেলার ভেলাতৈড় যৈদ্দপীর কবরস্থান থেকেও ১০-১১টি কঙ্কাল চুরি হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কবরস্থানটি এভাবে অরক্ষিত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকলে যেকোনো সময় আবারও বড় ধরনের কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটতে পারে।
কবরস্থানের এই সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার অভাবের বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছিল। তবে বর্তমানে যেন কোনোভাবেই কবরের ওপর ময়লা না পড়ে, সেজন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুতই এখানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে।”
স্থায়ী সমাধান প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আগামী ৫-৬ মাসের মধ্যে একটি চাইনিজ প্রতিনিধি দল ঠাকুরগাঁও জেলা পরিদর্শনে আসবেন। তারা এলে এই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু হবে এবং তখন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।
তবে পীরগঞ্জবাসীর দাবি, যতদিন না পর্যন্ত স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন হচ্ছে, ততদিন এই পবিত্র গোরস্থানটিকে ময়লা ফেলা থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে এবং চারদিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে পূর্বপুরুষদের শেষ ঠিকানার মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে।
মন্তব্য করুন