সর্বশেষ
||মৌলভীবাজার বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়||রেললাইনের পাশে পড়ে ছিল কলেজ অধ্যক্ষের মরদেহ||নওগাঁর মান্দায় ২৫ লিটার চোলাই মদসহ আটক ১||গ্রিড বিপর্যয় ও তীব্র লোডশেডিংয়ে অচল সাতক্ষীরা সদর: শহর থেকে গ্রামে ত্রাহি অবস্থা||নন্দিনীকে গলাটিপে হত্যা, বস্তায় ভরে মাটিচাপা— স্বীকারোক্তিতে বিধান||চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসন করা হবে: মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন||পাঁচলাইশে দুর্ধর্ষ চোর চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার: গলিত স্বর্ণ, নগদ টাকাসহ বিপুল মালামাল উদ্ধার||চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অনন্য সাফল্য: উদ্ধার হওয়া ১০১টি মোবাইল প্রকৃত মালিকদের হস্তান্তর||নিষেধাজ্ঞা শেষে চাঙ্গা কক্সবাজার ফিশারিঘাট: ট্রলারভর্তি রুপালি ইলিশ, চড়া দামেই কিনছেন ক্রেতারা||খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব নয়: মেয়র ডা. শাহাদাত

ঋণ বনাম সার্বভৌমত্ব: বৈশ্বিক অর্থনীতির বেড়াজালে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা

Share this news with

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি যতটা না সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়, তার চেয়ে বেশি তৈরি করে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই গোলকধাঁধায় পা রাখা অনেকটা রূপকথার সেই ‘সোনার হরিণ’ ধরার মতো—যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিলেও দিনশেষে হাতের নাগালে ধরা দেয় কেবল একরাশ ঋণ আর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশের মতো একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশে এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: আমরা কি আমাদের নিজস্ব শক্তিতে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছি, নাকি উন্নয়নের উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বিজাতীয় পুঁজির ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি যা আমাদের সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের ক্ষমতাকে খর্ব করছে?

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কখনোই একটি সমতল ক্ষেত্র ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশনস (আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে। কিন্তু কালক্রমে এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতি নির্ধারক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, যেকোনো সংকটে—তা হোক কোভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার কিংবা ডলার সংকট আমাদের আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়।

​এই ঋণগুলো কখনো শর্তহীন হয় না। ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা কাঠামোগত সংস্কারের নামে ভর্তুকি প্রত্যাহার, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং কর বৃদ্ধির মতো এমন কিছু প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয় যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। প্রশ্ন ওঠে, এই উন্নয়ন কি সাধারণ মানুষের জন্য, নাকি দাতা সংস্থার ঋণের কিস্তি নিশ্চিত করার জন্য? যখন ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে টান পড়ে, তখন অর্থনীতির ‘ন্যায্যতা’ নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়।

​গত এক দশকে বাংলাদেশে দৃশ্যমান উন্নয়নের এক জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো আমাদের অবকাঠামোগত চেহারা বদলে দিয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পেছনে রয়েছে বিশাল অংকের বৈদেশিক ঋণ। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বর্তমানে ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। যদিও আমাদের জিডিপি-ঋণ অনুপাত এখনো অনেক দেশের তুলনায় নিরাপদ সীমার মধ্যে, কিন্তু ভয়ের জায়গাটি হলো ঋণের গুণগত মান এবং পরিশোধের সক্ষমতা।

​আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক ঋণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। এই দেশগুলোর ঋণের শর্ত অনেক সময় অস্বচ্ছ থাকে এবং সুদের হারও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছাকাছি হয়। শ্রীলঙ্কার ‘হাম্বানটোটা বন্দর’ কিংবা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হলে উন্নয়ন কেবল বালুর বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে পারে। বাংলাদেশ যদি এই ঋণের টাকা দিয়ে এমন কোনো প্রকল্প নেয় যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় করতে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের এই সুফল বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াবে।

​উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আমরা কি ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি? ডাব্লিউটিও এর মতো সংস্থাগুলো মুক্ত বাণিজ্যের কথা বললেও উন্নত দেশগুলো প্রায়ই ‘শুল্কবহির্ভূত বাধা’ বা ‘শ্রম মান’-এর অজুহাতে আমাদের বাজার প্রবেশাধিকার সীমিত করে।

​বাস্তবতা হলো, আমরা যে শার্টটি ২০ ডলারে আমেরিকায় রপ্তানি করি, তার সিংহভাগ মুনাফা ভোগ করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো। আমাদের কপালে জোটে কেবল সস্তা শ্রমের মূল্য এবং পরিবেশ দূষণের গ্লানি। এটিই হলো প্রবিশ-সিঙ্গার তত্ত্বের  আধুনিক সংস্করণ, যেখানে কাঁচামাল বা শ্রম সরবরাহকারী দেশগুলো দিনশেষে দরিদ্রই থেকে যায়, আর প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডের মালিকরা ক্রমাগত ধনী হতে থাকে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই কাঠামোগত বৈষম্য বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে একটি ‘লো-ইনকাম ট্র্যাপ’-এ আটকে রাখছে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ডলারের একাধিপত্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক প্রকার ‘জুলুম’। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ যখন তাদের দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ায়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের টাকায়। টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে, আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং আমাদের মতো দেশগুলোতে ‘ইম্পোর্টেড ইনফ্লেশন’ বা আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হয়। আমাদের কোনো অপরাধ ছাড়াই সাধারণ মানুষকে চাল-ডালের বাড়তি দাম দিতে হয়। এই মুদ্রানীতির অসম প্রভাব প্রমাণ করে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র অর্থনীতির কোনো সুরক্ষা নেই।

​আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অন্যায় সম্ভবত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি, অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য। উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর জলবায়ু তহবিলে যে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়, তা হয় অপর্যাপ্ত না হয় ঋণের আকারে আসে। অর্থাৎ, অন্যের করা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেও আমাদের ঋণ নিতে হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক চরম অনৈতিক দিক।

নির্ভরশীলতার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে কেবল সস্তা শ্রম বা ঋণের ওপর ভরসা করলে চলবে না, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতার ভিত গড়তে হবে। এর প্রধান শর্ত হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা; আমাদের জিডিপি-কর অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ের হওয়ায় নিজস্ব সম্পদ বাড়ানো ছাড়া ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি অসম্ভব। পাশাপাশি, এককভাবে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও ঔষধ শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংগত করতে হবে। শ্রম বাজারের সনাতনী ধারা বদলে কেবল অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে, যা রেমিট্যান্সের গুণগত মান নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি, ডলারের একাধিপত্য ও বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সার্ক বা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক জোটগুলোকে সক্রিয় করে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া জরুরি, যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিকূলতা এড়িয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কখনোই পুরোপুরি ন্যায্য হবে না, কারণ এর চালিকাশক্তি হলো ক্ষমতা এবং মুনাফা। আমাদের বুঝতে হবে যে, ‘সাহায্য’ বা ‘ঋণ’ কখনো নিঃস্বার্থ হয় না। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক ব্যবস্থা যেখানে প্রবৃদ্ধি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশবান্ধব।

​বাংলাদেশের জন্য ঋণের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। যদি ঋণের টাকা স্বচ্ছতার সাথে ব্যবহৃত হয় এবং বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তবেই আমরা এই নির্ভরশীলতার বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারব। অন্যথায়, আমরা কেবল জিডিপির কাগুজে বৃদ্ধিতেই আটকে থাকব, আর সাধারণ মানুষের কাঁধে চেপে বসবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলা এক বিশাল ঋণের বোঝা। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই কঠিন দাবার বোর্ডে আমাদের কেবল ‘গুটি’ হলে চলবে না, বরং নিজেদের চাল নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মৌলভীবাজার বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়

রেললাইনের পাশে পড়ে ছিল কলেজ অধ্যক্ষের মরদেহ

নওগাঁর মান্দায় ২৫ লিটার চোলাই মদসহ আটক ১

গ্রিড বিপর্যয় ও তীব্র লোডশেডিংয়ে অচল সাতক্ষীরা সদর: শহর থেকে গ্রামে ত্রাহি অবস্থা

নন্দিনীকে গলাটিপে হত্যা, বস্তায় ভরে মাটিচাপা— স্বীকারোক্তিতে বিধান

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসন করা হবে: মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন

পাঁচলাইশে দুর্ধর্ষ চোর চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার: গলিত স্বর্ণ, নগদ টাকাসহ বিপুল মালামাল উদ্ধার

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অনন্য সাফল্য: উদ্ধার হওয়া ১০১টি মোবাইল প্রকৃত মালিকদের হস্তান্তর

নিষেধাজ্ঞা শেষে চাঙ্গা কক্সবাজার ফিশারিঘাট: ট্রলারভর্তি রুপালি ইলিশ, চড়া দামেই কিনছেন ক্রেতারা

খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব নয়: মেয়র ডা. শাহাদাত

১০

বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ মামলায় মনির হোসেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

১১

উচ্ছেদ অভিযানের পরও থামছে না প্যারাবন নিধন, সংকটে মহেশখালীর উপকূলীয় পরিবেশ

১২

এলডিসি গ্রাজুয়েশন ২০২৬ : নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্য কি প্রস্তুত বাংলাদেশ?

১৩

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মুটিং বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

১৪

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দোয়ারাবাজারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন

১৫

জনস্বার্থে জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা

১৬

সন্ধ্যার পর থেকেই বিদ্যুৎ নেই, চরম ভোগান্তিতে এলাকাবাসী

১৭

পুকুর আছে, পানি নেই—ধুনট উপজেলা পরিষদের জলাশয় নিয়ে নেই কোনো উদ্যোগ

১৮

রাবি ছাত্রদল নেতার উদ্যোগে অসহায় মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ

১৯

নওগাঁ পুলিশ লাইন্সে মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত, জনবান্ধব পুলিশিং জোরদারের নির্দেশ পুলিশ সুপারের

২০