
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর সোরা গ্রামে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধ, কৃষিজমি রক্ষা এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় সোরা দক্ষিণপাড়া মসজিদের পাশে স্থানীয় সর্বস্তরের এলাকাবাসীর উদ্যোগে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা ‘লবণ পানি নয়, নিরাপদ পরিবেশ চাই’, ‘মাটি বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’, ‘কৃষিজমি রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসুন’ এবং ‘সুন্দরবনের প্রাণ বাঁচাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মো. আজিজুর রহমান, মহিউদ্দিন খাজা, মিজানুর রহমান, হাবিবুর রহমান, আবু জাফর, মোজাম্মেল হোসেন, সাংবাদিক আজমীর হোসেন, মর্জিনা খাতুন ও নুর নাহারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবাধে লবণ পানি উত্তোলন ও বিস্তারের কারণে এলাকার কৃষিজমির উর্বরতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একসময়ের উর্বর ফসলি জমি এখন অনাবাদি হয়ে পড়ছে। ধান, শাক-সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কৃষকরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং অনেক পরিবার জীবিকা সংকটে পড়েছে। শুধু কৃষি নয়, লবণাক্ততার কারণে পুকুর, খাল ও জলাশয়ের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে এবং দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। গবাদিপশু পালন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, এলাকার দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে জোয়ার-ভাটার সময় লবণ পানি বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে কৃষিজমি, বসতভিটা ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করছে। অনেক সময় জোয়ারের পানিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপকূলীয় অঞ্চলের এই চরম দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বক্তারা বলেন, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে জোয়ারের সময় লাশ নিয়ে স্বজনদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়; ভাটার পানি না নামা পর্যন্ত দাফনের জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিকে তারা একটি চরম মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
উপস্থিত বক্তারা দাবি করেন, লবণ পানির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার শুধু মানুষের জীবন-জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপরও মারাত্মক আঘাত হানছে। তাই উপকূলীয় জনগণের জীবন, সম্পদ ও কৃষি রক্ষায় দ্রুত টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।
সমাবেশ থেকে প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধ, কৃষিজমি সংরক্ষণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি তোলেন তারা। মানববন্ধন শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, লবণ পানির আগ্রাসন বন্ধ এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদন আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।
মন্তব্য করুন