
“একই গর্ভে জন্ম, একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা, একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, একই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—আর ফলাফলও এক”
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেছে বরগুনার শিক্ষক দম্পতির ত্রিযমজ কন্যা অন্বেশা হালদার, অঙ্কিতা হালদার ও অনুষ্কা হালদার। তাদের এই বিরল সাফল্যে আনন্দে ভাসছে পরিবার, বিদ্যালয় এবং পুরো এলাকা।
তিন বোনের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামে। বাবা চিন্ময় হালদার গৌরীচন্না নওয়াব সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মা কাজলী রানী গৌরীচন্না হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বাবা-মায়ের স্নেহ, সুশাসন ও শিক্ষকের দায়িত্বশীল দিকনির্দেশনার পাশাপাশি নিজেদের কঠোর অধ্যবসায়েই তারা অর্জন করেছে এই ঈর্ষণীয় সাফল্য।
এবারের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৬ গৌরীচন্না হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দারুণ ফল করেছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনই বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ৭ জন ট্যালেন্টপুলে এবং ৪ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেছে। মাত্র একজন শিক্ষার্থী বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একই পরিবারের ত্রিযমজ তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জনের ঘটনা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদ্য প্রকাশিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বরগুনার ছয় উপজেলায় মোট ৭৫৮ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে ৩৫৬ জন এবং সাধারণ গ্রেডে ৩৬৩ জন বৃত্তি অর্জন করেছে। এছাড়া বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে ১৬ জন ও সাধারণ গ্রেডে ২৩ জন বৃত্তি পেয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভাষ্য, অন্বেশা, অঙ্কিতা ও অনুষ্কা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী। বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি বাসায়ও নিয়মিত অনুশীলন করত তারা। একজনের সাফল্য অন্য দুজনকে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেই সুস্থ প্রতিযোগিতা, পারিবারিক সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের আন্তরিক তত্ত্বাবধানই তাদের আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
যমজ তিন কন্যার বাবা চিন্ময় হালদার বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ওদের পড়াশোনার প্রতি আলাদা আগ্রহ ছিল। কখনোই পড়তে জোর করতে হয়নি। তারা প্রতিটি বিষয় বুঝে শেখার চেষ্টা করত। তিনজনের মধ্যে দারুণ একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। কেউ কোনো বিষয় না বুঝলে অন্য দুজন বুঝিয়ে দিত। ওরাই একে অপরের সবচেয়ে বড় সহপাঠী ও অনুপ্রেরণা।”
তিনি আরও বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি ওরা ভদ্র, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বশীল। অবসর সময়ে বই পড়ে, ছবি আঁকে এবং নিজেদের মধ্যে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওদের মা, শিক্ষকদের এবং মহান সৃষ্টিকর্তার। আমি সবার কাছে আমার তিন মেয়ের জন্য দোয়া চাই।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একই পরিবারের ত্রিযমজ তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পাশাপাশি ১২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনের বৃত্তি অর্জনও আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার সফল ফল।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এ্যাড.আব্দুল ওয়াসী মতিন বলেন, ‘এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো বরগুনার গর্ব। এমন সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষার প্রতি আরও উৎসাহিত করবে।’
স্থানীয়দের মতে একই পরিবারের তিন কন্যার এই ব্যতিক্রমী অর্জন এখন বরগুনার শিক্ষাঙ্গনে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাদের গল্প প্রমাণ করে—সুশিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।
মন্তব্য করুন