
গ্রামীণ জনপদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ (চৌকিদারী ব্যবস্থা) সদস্যদের কাজের স্বীকৃতি ও কর্মস্পৃহা বাড়াতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ চালু হয়েছে নওগাঁ জেলায়। জেলা পুলিশে বর্তমান পুলিশ সুপার (এসপি) মহোদয় যোগদান করার পর থেকেই মাঠপর্যায়ের এই নীরব কর্মীদের মূল্যায়ন করতে ‘মাসিক সেরা গ্রাম পুলিশ’ পুরস্কারের প্রথা চালু করেন।
তারই ধারাবাহিকতায়, গত মে/২০২৬ মাসে কর্মক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিয়ামতপুর থানার গ্রাম পুলিশ জনাব মনসুর আলী-কে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। জেলা পুলিশের নিয়মিত ক্রাইম কনফারেন্সে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
চৌকিদারী প্যারেড ও গ্রাম পুলিশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আজকের আধুনিক গ্রাম পুলিশ ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রথম আনুষ্ঠানিক আইনি পদক্ষেপ ছিল ১৮৭০ সালের গ্রাম চৌকিদারি আইন (The Village Chaukidari Act, 1870)। ১৮৭০ সালের ১৯ অক্টোবর লর্ড মেয়োর শাসন আমলে এই আইনটি পাস হয়, যা পরবর্তীতে বাংলার গ্রামীণ পর্যায়ে আজকের ‘ইউনিয়ন পরিষদ’ এবং ‘গ্রাম পুলিশ’ ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
পরবর্তীতে পুলিশ রেগুলেশন্স বেঙ্গল, ১৯৪৩ (PRB)-এর ৩৭০ থেকে ৩৭২ বিধি অনুযায়ী চৌকিদারদের থানায় এসে নিয়মিত হাজিরা দেওয়া এবং তথ্য সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই বিধিমালার ওপর ভিত্তি করেই মূলত আধুনিক ‘চৌকিদারী প্যারেড’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। পিআরবি (PRB) নিয়ম অনুযায়ী, চৌকিদাররা নিজ নিজ এলাকার খুন, ডাকাতি, চুরি, দাঙ্গা, বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মতো ১৭ প্রকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই প্যারেডে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবহিত করেন।
জেলা পুলিশ ও গ্রাম পুলিশের পরিপূরক বন্ধন
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাংলাদেশ পুলিশকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছে গ্রাম পুলিশ। মূলত গ্রামে রাতে পাহারা দেওয়া, অপরাধ প্রতিরোধ করা, সন্দেহভাজনদের ওপর নজর রাখা এবং স্থানীয় থানাকে দ্রুত অপরাধের তথ্য দেওয়াই তাদের প্রধান কাজ।
জেলা পুলিশ এবং গ্রাম পুলিশের সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্যের আদান-প্রদান এবং গ্রামীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি পরিপূরক বন্ধন। গ্রাম পুলিশ সরাসরি জেলা পুলিশের অংশ না হলেও, তারা মাঠপর্যায়ে জেলা পুলিশের তথ্যের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। এমনকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনেও গ্রামীণ পর্যায়ে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা অনবদ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন।
কাজের স্বীকৃতিতে বাড়ছে উদ্দীপনা
নওগাঁ জেলা পুলিশের এই নতুন উদ্যোগের ফলে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাঝে দায়িত্ব পালনে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
পুরস্কার প্রাপ্তির পর নিয়ামতপুর থানার গ্রাম পুলিশ জনাব মনসুর আলী তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ”পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছ থেকে এই সম্মাননা পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এই পুরস্কার আমাদের মতো সাধারণ মাঠকর্মীদের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ আরও বাড়িয়ে দিল।”
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ জনপদের নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং জেলা পুলিশের সাথে গ্রাম পুলিশের এই সমন্বিত বন্ধন আরও দৃঢ় করতে প্রতি মাসের ক্রাইম কনফারেন্সে ভালো কাজের জন্য গ্রাম পুলিশ সদস্যদের এই পুরস্কার প্রদানের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্য করুন