
বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে জুয়ার বিস্তার। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও থেমে নেই তাস, পাশা, হাউজি ও অনলাইনভিত্তিক জুয়ার আসর। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ মোবাইলভিত্তিক বেটিং ও অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে পরিবার ও সমাজে।
এদিকে, বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় জুয়া বিরোধী অভিযানে একাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষিত ও বিভিন্ন পেশার মানুষও জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।
বর্তমানে সারাদেশের ন্যায় বগুড়াতেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে অনলাইন জুয়া। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এসব কার্যক্রম। সম্প্রতি শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক অনলাইন জুয়ার এজেন্টকে আটক করে র্যাব। এ সময় একটি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনি বিভিন্ন অনলাইন বেটিং সাইট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক তরুণ রাতভর মোবাইল ফোনে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বেটিংয়ে অংশ নিচ্ছে। প্রথমে বিনোদন হিসেবে শুরু হলেও পরে এটি আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
জুয়ার বিস্তার এখন শুধু বেকার বা অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি বগুড়ার ধুনট উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের পীরহাটি গ্রামের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুই প্রধান শিক্ষক, এক আইনজীবীসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় জুয়ার সরঞ্জাম ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজের শিক্ষিত অংশ জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নেতিবাচক বার্তা বহন করছে।
এছাড়াও দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, ধুনট, শাজাহানপুর ও সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। চলতি বছর দুপচাঁচিয়ায় মাদক ও জুয়া মামলায় নারীসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে আদমদীঘিতে হাউজি জুয়ার আসরে অভিযান চালিয়ে ১৩ জনকে আটক করে পুলিশ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গোপনে জুয়ার আসর পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও চায়ের দোকানের আড়ালে, কোথাও নদীপাড় বা নির্জন বাড়িতে রাতভর চলছে টাকার খেলা।
ঈদ, মেলা বা বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করেও বাড়ছে হাউজি ও তাসভিত্তিক জুয়ার আয়োজন। প্রশাসনের অভিযান শেষে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পরে আবার নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রগুলো। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ার অভিযোগও রয়েছে।
জুয়ার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও অপরাধ চক্রেরও সংযোগ তৈরি হচ্ছে। কিছু তরুণ জুয়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই, মাদক, এমনকি খুনের পথেও জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের ভাষ্য, সহজে টাকা আয়ের লোভে অনেক কিশোর ও তরুণ জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এতে পড়াশোনায় অনাগ্রহ, পরিবারে অশান্তি, ঋণগ্রস্ততা ও অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া মোবাইল ফোন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে সন্তানরা কখন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সচেতন মহল বলছে, একসময় গ্রামাঞ্চলের নির্জন তাসের আসর কিংবা গোপন জুয়ার আড্ডায় সীমাবদ্ধ থাকা এই প্রবণতা এখন প্রযুক্তির বিস্তারে পৌঁছে গেছে স্মার্টফোনের পর্দায়। ফলে খুব সহজেই কিশোর ও তরুণরা অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ভয়ংকর নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। যার ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন উঠছে, জুয়ার বিস্তারে কোন পথে এগোচ্ছে বগুড়া?
র্যাব-১২ এর কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার ফিরোজ আহমেদ বলেন, সাইবার স্পেসে পরিচালিত অনলাইন জুয়া ও অপরাধ দমনে র্যাবের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
বগুড়ায় জুয়ার বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। গ্রামের গোপন আসর থেকে শুরু করে স্মার্টফোনভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম – সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে এর প্রভাব। প্রশাসনের অভিযান চললেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ।
মন্তব্য করুন