
‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু শিশুদের জন্য অন্তত একটু ভাত চাই’—বন্যাকবলিত এক মায়ের এমন আকুতির সংবাদ প্রকাশের পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বান্দরবানের স্থায়ী বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত মেজর ওয়ংটিং।
সোমবার (১৩ জুলাই) বান্দরবান সদর উপজেলার লেমুঝিড়ি পাড়া, উজানীপাড়া এবং জেলা শহরসংলগ্ন সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ১৬০টি বন্যাকবলিত পরিবারের মধ্যে খাদ্য ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লেমুঝিড়ি পাড়ার ৬০টি পরিবার সহায়তা পেয়েছে।
ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করে লাঃনিং রং ওফোয়েঃ যুব কল্যাণ সমিতি। প্রতিটি পরিবারের হাতে পাঁচ কেজি আলু, এক কেজি ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ, এক প্যাকেট মোমবাতি, মুড়ি এবং পাঁচ লিটার বিশুদ্ধ মিনারেল পানি তুলে দেওয়া হয়।
ত্রাণ নিতে আসা ৭৫ বছর বয়সী শৈম্রাউ মারমা ও ৭০ বছর বয়সী শৈও য়াং প্রু মারমাসহ কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, কয়েক দিনের ভয়াবহ বন্যায় তাদের ঘরে থাকা খাদ্য মজুত শেষ হয়ে গেছে। এই সহায়তা অন্তত কয়েক দিনের জন্য তাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে।
স্থানীয় সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য মেয়ই মারমা বলেন, বন্যার সময় অনেক পরিবার দীর্ঘদিন পানিবন্দী ছিল। পানি নামতে শুরু করলেও অধিকাংশ মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এমন সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেওয়া এই সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রাণ বিতরণকালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর ওয়ংটিং বলেন, ‘দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। গত ৯ জুলাই প্রকাশিত একটি সংবাদে বন্যাকবলিত মানুষের অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে নিজ উদ্যোগে খাদ্য ও জরুরি সামগ্রী নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই।’
তিনি বলেন, ‘আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। ভয়াবহ বন্যার কারণে বান্দরবানে আসা সম্ভব হয়নি। নদীর পানি কমতে শুরু করেছে শুনে রাতেই রওনা দিই। কেরানীহাট পর্যন্ত বাসে এসে সেখান থেকে মাহিন্দ্রাযোগে বান্দরবানে পৌঁছাই। সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় ঘুরে ঘুরে ত্রাণ বিতরণ করছি। ভবিষ্যতেও সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করব।’
ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে বান্দরবান প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাচ্চু, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পুলু প্রু, তহজিংডং-এর নির্বাহী পরিচালক চিংসিং মং মারমাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সোমবার সকালে জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। প্লাবিত জনপদে মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।
যেসব বাড়িঘর আংশিক অক্ষত রয়েছে, সেসব পরিবারের সদস্যরা কাদা ও ময়লা পরিষ্কার করে বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন। কেউ আসবাবপত্র রোদে শুকাচ্ছেন, আবার কেউ ভেঙে যাওয়া দেয়াল ও বেড়া মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
অন্যদিকে, যেসব পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার স্রোতে আংশিক বা পুরোপুরি ভেসে গেছে, তারা এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই জানেন না, কবে আবার নিজের ঘরে ফিরতে পারবেন কিংবা নতুন করে কোথায় আশ্রয় গড়ে তুলবেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নতুন করে বন্যার আশঙ্কা কমলেও এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খাদ্য সহায়তা, নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি, গৃহ মেরামতের উপকরণ এবং কৃষকদের জন্য পুনর্বাসন সহায়তা। কারণ বন্যার পানি সরে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।
মন্তব্য করুন