
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান সংকট ও তা নিরসনে করণীয় সম্পর্কে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান-এর সঙ্গে তার কার্যালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান-এর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান বহুমুখী সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং শিল্পের টিকে থাকা ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেন।
প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমান, পরিচালক ড. রশিদ আহমেদ হোসাইনী এবং মাহিন অ্যাপারেলস লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ-আল-মাহমুদ মাহিন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। অনেক ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ করলেও প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সরবরাহে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে অনেক কারখানার পক্ষে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ সময় বিজিএমইএ নেতারা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে নীতি সহায়তার আওতায় নগদ সহায়তার হার বৃদ্ধি এবং তা বহাল রাখার জোরালো আহ্বান জানান। প্রতিনিধিদল বিশেষ নগদ সহায়তার হার ০.৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ, শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তার হার ১.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন।
তারা আরও উল্লেখ করেন যে, প্রণোদনার অর্থ দ্রুততম সময়ে ও নিয়মিত ছাড় করা না হলে অনেক কারখানা অচিরেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দেশের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া শিল্পকে সহায়তা দিতে প্যাকিং ক্রেডিটের (পিসি) সুদের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের পরিমাণ ৫,০০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০,০০০ কোটি টাকা করা এবং এই তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। একইসঙ্গে রপ্তানি ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা এবং এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবনা ও শিল্পের বর্তমান সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে শোনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আশ্বস্ত করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলোতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নগদ সহায়তার বিষয়ে তিনি জানান, এখন থেকে কোনো আবেদন অযথা পেন্ডিং রাখা হবে না এবং রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট নিরসনে প্রতি মাসের নগদ সহায়তার অর্থ সংশ্লিষ্ট মাসেই ছাড় করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় প্রতিনিধিদল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাবেক (EXIM Bank Bangladesh, First Security Islami Bank) সহ অন্যান্য বিভিন্ন শাখায় জমাকৃত স্থায়ী আমানত এবং রপ্তানি মূল্যের অর্থ নগদায়ন করতে না পারার সমস্যার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তারা জানান, তারল্য সংকটের কারণে অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিলসহ দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ বিষয়ে গভর্নর জানান, সমস্যাগুলো সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকি করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈঠক শেষে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দ্রুত পদক্ষেপগুলো দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে এবং লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন