
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে বিচ্ছিন্ন অলিগলি, ঘাট, বাজার ও জনবিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলসহ নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি—মাদক ও কিশোর গ্যাং। এক সময় যারা স্কুল, মাঠ আর খেলার সাথী ছিল, আজ তাদের একটি অংশ ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের মতো মাদকের কালো জগতে জড়িয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে গড়ে উঠছে সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং, যারা এখন আর শুধু ভবঘুরে নয়, হয়ে উঠছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সহিংসতার নতুন বাহিনী।
স্থানীয়রা বলছেন, আজ যদি হোসেনপুর কিশোরদের রক্ষা করা না যায়, তবে আগামী দিনের এ উপজেলা অপরাধ আর অস্থিরতার দ্বীপে পরিণত হবে—এই আশঙ্কা এখন আর অনুমান নয়, বাস্তবতার খুব কাছাকাছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হোসেনপুরে কয়েকটি চিহ্নিত এলাকায় প্রভাবশালী মাদক কারবারিরা ইচ্ছাকৃতভাবে কিশোরদের টার্গেট করছে। শুরুটা হয় ‘ফ্রি’ নেশা দিয়ে, এরপর ধীরে ধীরে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে বাহক, পাহারাদার ও ছোটখাটো অপরাধে।
জিনারী, গোবিন্দপুর,সিদলা সাহেদল পুমদীর পৌরসভার সীমান্তে মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট, নম্বর বিহীন লস্কংর ঝক্কর হোন্ডা হোসেনপুরে মাদক ঢোকার নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই রুট ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী চক্র নিয়মিত মাদক এনে বাজারজাত করছে, আর কিশোর গ্যাং সেই সরবরাহ ব্যবস্থার নিচের স্তরে কাজ করছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কয়েকটি কিশোর গ্যাং এখন আর শুধু নেশায় আসক্ত নয়—তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, অস্ত্র প্রদর্শন এমনকি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান আনছে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল। অভিযোগ আছে, বড় মাদক কারবারিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, অথচ ধরা পড়ছে কেবল ছোট বাহক বা কিশোররা।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, স্কুল ও পরিবারভিত্তিক নজরদারি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে আনা, কিশোর সংশোধনমূলক কার্যক্রম জোরদার, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ছত্রচ্ছায়া বন্ধ করতে পারলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, “ছেলেটা এক বছর আগেও স্কুলে যেত। এখন দিন-রাত ফোনে ব্যস্ত, টাকার জন্য ঝগড়া করে। পরে জানতে পারি সে ইয়াবার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।”
একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, “মাদক ও গ্যাং কালচার সরাসরি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে। অনেক শিক্ষার্থী অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে। পরিবার যদি সময়মতো সতর্ক না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
সালাউদ্দিন নামে একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা কাজের ব্যস্ততায় সন্তানদের সময় দিতে পারছি না। এই সুযোগে মাদক কারবারিরা আমাদের সন্তানদের হাতছানি দিচ্ছে। শুধু পুলিশ নয়, আমাদেরও দায়িত্ব আছে।”
হোসেনপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক যু্বদলের সিনিয়র সহ যুগ্ম আহবায়ক মশিউর রহমান চন্দন বলেন, “মাদক ও কিশোর গ্যাং শুধু অপরাধ নয়, এটি সামাজিক ব্যর্থতা। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি।”
হোসেনপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, “সব কিশোরই খারাপ নয়। কিন্তু সুযোগ আর দিকনির্দেশনা না পেলে তারা ভুল পথে যায়। তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ, চাকরি ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করলে কিশোর গ্যাং আপনা-আপনি কমে যাবে।”
ঢাকা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি ও হোসেনপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক এডভোকেট মনিরুল হক রাজন বলেন, “মাদক হারাম এবং সমাজ ধ্বংসের মূল কারণ। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পুলিশ যদি মাদক সেবনকারীদের ধরে এনে কঠিন আইনি ধারা গুলো অনুস্বরণ করে কোর্টে প্রেরণ করেন, তাহলে বছর -ছয়েক মাস আগে জামিন হবে না, জেল থেকে বের হয়ে সহজে এ পেশা নামবে না। পুলিশ নরমাল ধারা দিয়ে কোর্টে চালান করে দেয় কিছু দিন জেল কেটে সহজে আসামিরা বের হয়ে যায়। বের হয়ে আবার এ পেশায় আরো শক্তিশালী হয়ে জড়িয়ে পড়ে।
হোসেনপুর থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে মূল শক্তি হলো মাদক ব্যবসায়ী চক্র। আমরা ছোটদের ধরার পাশাপাশি মূল হোতাদের শনাক্তে কাজ করছি। তবে এ চক্র রাজনৈতিক স্যাল্টার পায় তাই তাদের গ্রেফতার করতে বেশ চ্যালেঞ্জ।
হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী নাহিদ ইভা বলেন, “মাদক ও কিশোর গ্যাং একটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। হোসেনপুরে মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, পরিবার ও সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে। কিশোরদের স্কুলমুখী ও খেলাধুলায় ফেরাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়—এটি শিক্ষা, পরিবার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীর সংকটের প্রতিফলন। স্কুলমুখী না হওয়া, খেলার মাঠ হারিয়ে যাওয়া, বেকারত্ব ও প্রযুক্তির অপব্যবহার—সব মিলিয়েই হোসেনপুর কিশোররা ঝুঁকির মুখে।
মন্তব্য করুন