এন.এ, বিশেষ প্রতিনিধি
২৯ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৩৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান: দেশের জন্য আকাশপথে আত্মত্যাগের এক অমর ইতিহাস

Share this news with

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বীরত্ব, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের অনন্য প্রতীক বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রত্যয়ে একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সেই দুঃসাহসিক প্রচেষ্টার মধ্যেই ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট প্রাণ হারান এই বাঙালি বৈমানিক। তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করে।

জন্ম ও শৈশব

১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগাসাদেক রোডে জন্মগ্রহণ করেন মতিউর রহমান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল শৃঙ্খলাবোধ, অধ্যবসায় ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ। পরবর্তী সময়ে তিনি সামরিক বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বৈমানিক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে দেশপ্রেমের টান

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে মতিউর রহমান ছুটিতে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

পরে তিনি পাকিস্তানে ফিরে গেলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। সে সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তাদের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও তিনি নিজের দেশকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসেননি।

প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে দুঃসাহসিক অভিযান

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটিতে মতিউর রহমান একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে পাকিস্তান ত্যাগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। বিমানটির কলসাইন ছিল ‘ব্লু বার্ড-১৬৬’। সে সময় বিমানটি চালাচ্ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা রশিদ মিনহাজ।

মতিউর রহমান বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেটিকে ভারতের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া। কিন্তু আকাশে ওড়ার পর বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই বৈমানিকের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

একপর্যায়ে বিমানটি পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের ঠাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এতে মতিউর রহমান ও রশিদ মিনহাজ—দুজনই নিহত হন। মতিউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা সফল না হলেও তাঁর এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

দুই দেশের দুই সামরিক সম্মান

মতিউর রহমানের মৃত্যুর পর পাকিস্তানে তাঁকে বিমানঘাঁটির একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর আত্মত্যাগ ও অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক সম্মান, যা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাতজন বীরকে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, রশিদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘নিশান-ই-হায়দার’ প্রদান করে। একই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত দুই বৈমানিককে নিজ নিজ দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানে ভূষিত করার ঘটনা ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

৩৫ বছর পর মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন

মৃত্যুর পর দীর্ঘ ৩৫ বছর পাকিস্তানে সমাহিত ছিলেন মতিউর রহমান। অবশেষে ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ২৫ জুন ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে তাঁর দেহাবশেষ মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনার ঘটনাটি দেশবাসীর কাছে ছিল গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার মুহূর্ত।

ইতিহাসে অমর এক বৈমানিক

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জীবন কেবল একজন সামরিক বৈমানিকের জীবনের গল্প নয়; এটি দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য অধ্যায়। নিজের পেশাগত অবস্থান ও ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বড় করে দেখেছিলেন তিনি।

আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ উপলব্ধি করার গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বেঁচে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, সহযোগিতার আশ্বাস রাষ্ট্রপতির

১

উলিপুরে শোবার ঘর থেকে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার, পলাতক স্বামী-শাশুড়ি

২

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান: দেশের জন্য আকাশপথে আত্মত্যাগের এক অমর ইতিহাস

৩

সান্তাহারে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের খেলোয়াড় বাছাই শুরু

৪

কুড়িগ্রামে ক্যাম্পাসভিত্তিক কার্যক্রম জোরদারে ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীলদের মতবিনিময় সভা

৫

জনগণের আস্থা অর্জনই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৬

তারাকান্দায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় প্রাণ গেল দুই বোনের

৭

আদমদীঘিতে সাংবাদিকদের কটাক্ষ করে ফেসবুকে এসিল্যান্ডের স্ট্যাটাস

৮

কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যার মামলায় হানিফের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন

৯

জাতীয় সাঁতারের প্রথম দিনেই ছয় নতুন রেকর্ড, পদক তালিকায় শীর্ষে নৌবাহিনী

১০

৬০ কিমি বেগে দেশের ৮ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত

১১

দীঘিনালায় সাত পাহাড়ি পরিবারকে ১৪টি ছাগল দিল সেনাবাহিনী

১২

ধুনটে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে যুব সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য র‍্যালি

১৩

আদমদীঘিতে মৃত শ্রমিকের পরিবার ও শ্রমিকের মেয়েদের অনুদানের চেক বিতরণ

১৪

পল্টন ট্র্যাজেডি স্মরণে কুড়িগ্রামে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

১৫

সান্তাহারে নানা আয়োজনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

১৬

ধুনটে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে র‍্যালি

১৭

জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা ব্যক্তিরাই জুলাইকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করেছেন: জাবের

১৮

ছুটি নিয়ে প্রশ্নের মুখে ভাইরাল ইউএনও, সেবা না পেয়ে ফিরছেন মানুষ

১৯

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মাঠে থাকবে এসআরবি-১৩

২০