আশেকে এলাহী শিবলী, ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি
১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ধুনটে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির নিপুণ শিল্পী বাবুই, আকাশে নেই সেই চেনা উড়াউড়ি

Share this news with

‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই’—কবি রজনীকান্ত সেনের এই পঙক্তি আজও তৃতীয় শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে জীবন্ত। তবে বাস্তবের মাঠ-প্রান্তরে বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা এখন প্রায় দুর্লভ দৃশ্য। বইয়ের পাতা ও শিক্ষকের বর্ণনাতেই এখনকার শিশুরা চিনছে প্রকৃতির এই নিপুণ বুননশিল্পীকে। গ্রামবাংলার আকাশে-গাছে বাবুইয়ের সেই পরিচিত উড়াউড়িও এখন প্রায় হারিয়ে গেছে।

প্রকৌশলবিদ্যাকেও হার মানায় বাবুইয়ের বাসা

খড়ের চিকন কাঠি বুনে দোলনার মতো বাসা তৈরি করা বাবুই পাখি একসময় তাল, নারকেল ও সুপারি গাছের ডালে দলবেঁধে বসবাস করত। তাদের কিচিরমিচিরে মুখর থাকত গ্রামের সকাল-বিকেল।

ধুনট উপজেলায় একসময় তিন প্রজাতির বাবুই—বাংলা, দাগি ও দেশি—দেখা যেত। এর মধ্যে বাংলা ও দাগি বাবুই এখন প্রায় বিলুপ্ত। টিকে আছে শুধু দেশি বাবুই, তাও সীমিত সংখ্যায়।

বাবুইয়ের বাসা তৈরির কৌশলও রীতিমতো বিস্ময়কর। ঝড়-বাতাসেও যাতে বাসা সহজে হেলে বা পড়ে না যায়, সেজন্য পুরুষ বাবুই অত্যন্ত মজবুত ও নিপুণভাবে বাসা বুনে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে। বাসা তৈরির একটি পর্যায়ে সে সঙ্গিনী খোঁজে। স্ত্রী পাখি বাসাটি পছন্দ করলে দুজনের যৌথ শ্রমে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।

একসময় ধুনটের বিভিন্ন এলাকায় উঁচু তালগাছের সারিতে ঝুলে থাকা অসংখ্য বাবুইয়ের বাসা দেখে মনে হতো, যেন গাছের কানে দুল পরানো হয়েছে। কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন প্রায় স্মৃতি।

আবাসস্থল সংকটে অস্তিত্ব হুমকিতে

পাখি ও পরিবেশপ্রেমী সংগঠন রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পরিচালক ও সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নাবিল বলেন, জীববৈচিত্র্য নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা ও সচেতনতার অভাবেই নির্বিচারে তাল, খেজুর ও নারকেল গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ এসব গাছই ছিল বাবুই পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

তিনি বলেন, শুধু শাস্তির ব্যবস্থা করলেই হবে না; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং সরকারের উৎসাহমূলক উদ্যোগ। ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছ সংরক্ষণে ভাতা চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও খেজুরবীজ রোপণে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী আখিনুর জামান বকুল বলেন, সাপ ও ঝড়ের হাত থেকে নিরাপদ থাকতে বাবুই সাধারণত শাখা-প্রশাখাবিহীন উঁচু তাল, নারকেল ও খেজুরগাছ বেছে নেয়। কিন্তু দ্রুত ফল পাওয়ার মানসিকতার কারণে এসব দেশীয় গাছ রোপণে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। এসব গাছে ফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা বর্তমান সময়ে অনেকের কাছেই অনাগ্রহের বিষয়।

তিনি বলেন, কোনো এলাকায় বাবুইয়ের বাসা থাকা মানে সেখানকার পরিবেশ এখনো তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও বাসযোগ্য। আর বাবুই হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি সতর্কসংকেত।

কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারও বড় কারণ

বাবুই পাখি কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারকে দায়ী করছেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা। অতিরিক্ত কীটনাশকের কারণে জমির বিভিন্ন পোকামাকড় ও ঘাসফড়িং কমে যাচ্ছে। এসবই ছিল বাবুইয়ের অন্যতম প্রধান খাদ্য।

খাদ্যসংকটের কারণে পাখিটির প্রজনন ও টিকে থাকা দুটোই হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গাছ রোপণে সামাজিক উদ্যোগ

তবে আশার কথা হলো, গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে রাস্তার ধারে, নদীতীরে ও পতিত জমিতে তাল-খেজুরের বীজ রোপণের সামাজিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। ধুনটসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাবুইয়ের আবাসস্থল ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রশাসনের কাছে নেই সুনির্দিষ্ট তথ্য

ধুনট উপজেলায় বাবুই পাখির সংখ্যা, আবাসস্থল সংকট এবং এ পাখি রক্ষায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বা প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ আছে কি না জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোছা. রেহানা খাতুন বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের দপ্তরের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

তবে বাবুই পাখি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিবেশের অভাব এবং তাদের বসবাসের জায়গা ধ্বংস হয়ে যাওয়াই এর অন্যতম প্রধান কারণ। সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং বন উজাড় রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই বাবুই পাখি রক্ষা করা সম্ভব।

অভয়াশ্রম গড়ার তাগিদ

পরিবেশবাদীদের মতে, প্রকৃতির ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই বাবুইসহ দেশীয় পাখির জন্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি তাল, খেজুর, নারকেলসহ বাবুইয়ের উপযোগী গাছ রোপণ এবং পাখি শিকার বন্ধে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করতে হবে।

এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতা ও ছবিতেই বাবুই পাখিকে চিনবে; প্রকৃতিতে জীবন্ত বাবুই দেখার সুযোগ তাদের নাও হতে পারে। গ্রামীণ ঐতিহ্য ও প্রকৃতির এই অনন্য সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নোয়াখালীতে ‎জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করলেন এমপি শাহজাহান

১

দেড় মিনিটে মন্ত্রীকে ২৫ বার ‘স্যার’, সেই ইউএনও আবারও আলোচনায়

২

গুলশানে মার্কিন নাগরিকের অস্বাভাবিক আচরণ, দূতাবাসে নেওয়ার তথ্য

৩

ধুনট উপজেলা প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি ঘোষণা, সভাপতি লিখন ও সম্পাদক রাকিবুল

৪

অশ্রুসজল চোখে প্রতিমা বিসর্জন, কুড়িগ্রামে শেষ হলো দুর্গোৎসব

৫

অতিরিক্ত ক্লাসের আড়ালে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, গ্রেপ্তার মাদ্রাসাশিক্ষক

৬

বগুড়ায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারে ডিএনসিকে দুই মোটরসাইকেল দিল চেম্বার

৭

কক্সবাজারে সাগরে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন, ৪৫ মিনিটে বিদায় ৩৮০ প্রতিমার

৮

শেরপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিটি পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা দিলেন শহিদুল ইসলাম

৯

লাকসামের নাওটি স্টেশনে কর্ণফুলী কমিউটারের চার বগি লাইনচ্যুত

১০

বাংলাদেশ লেবার পার্টির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আলোচনা সভা

১১

আদমদীঘিতে সাইবার সুরক্ষা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গ্রেফতার

১২

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ

১৩

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কনস্যুলার সুরক্ষার ঘাটতি কোথায়?

১৪

আতঙ্ক কাটিয়ে লালন আখড়াবাড়িতে জনস্রোত, শেষ হলো স্মরণোৎসব

১৫

দুই বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় সৌদি আরবকে লাল কার্ড দেখাল ছাত্র ফেডারেশন

১৬

ধুনটে স্ত্রীকে বিয়ে করায় বন্ধুর ছুরিকাঘাতে বন্ধু হাসপাতালে

১৭

ষড়যন্ত্র থেমে নেই—দুর্গাপূজা নিয়ে নোয়াখালীতে বিস্ফোরক মন্তব্য ছাত্রদল নেতার

১৮

নিজ অর্থায়নে জাবির মুক্তমঞ্চে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন

১৯

তিন দিনের লালন উৎসবের দ্বিতীয় দিন ছেঁউড়িয়ায় উৎসবের আমেজ, রাতভর বাউলগান

২০