
গ্রেপ্তার আতঙ্কে যেন থমকে গেছে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রাম। সাত বছরের শিশু নন্দিনী রানী হত্যা মামলার পর পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি গাড়ি ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অজ্ঞাতনামা প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরপর থেকেই গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে ভীতিকর নীরবতা। অধিকাংশ পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে থাকায় পুরো গ্রাম প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নন্দিনী হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একদিকে শিশুহত্যার শোক, অন্যদিকে গ্রেপ্তারের আতঙ্ক দুই সংকটে এখন থমথমে পুরো এলাকা।
গত ১৬ জুন আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রানীর বস্তাবন্দি ও মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত নন্দিনী স্থানীয় কৃষক নলনী বর্মণের মেয়ে। আগের দিন বিকেল থেকে নিখোঁজ থাকার পর পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার হলে এলাকায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানায়, তদন্তে নন্দিনীর আত্মীয় (চাচা সম্পর্কের) বিধান বর্মণকে (১৯) প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে আটক করলে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু অভিযুক্তকে নিয়ে ফেরার সময় পুলিশের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও ইউএনওর সরকারি গাড়িসহ একাধিক যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।
এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে পৃথক মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলায় অজ্ঞাতনামা প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান আসাদ জানিয়েছেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিওচিত্র ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার করা হবে।
এদিকে শিশু নন্দিনী হত্যা মামলায় তার বাবা নলনী বর্মণ বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রধান আসামি বিধান বর্মণকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই ঘটনায় বিধানের বাবাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তের মা এখনও পলাতক রয়েছেন।
সরেজমিনে ফলিমারী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়িতেই পুরুষ সদস্য নেই। পুলিশের অভিযানের আশঙ্কায় অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। গ্রামের অলিগলি, বাজার ও আড্ডাস্থলগুলোও প্রায় ফাঁকা। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যেও বিরাজ করছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি থাকায় অনেক নিরীহ মানুষও আতঙ্কে রয়েছেন। ফলে সন্ধ্যা নামার আগেই মানুষ ঘরে ফিরে যাচ্ছেন, অনেক পরিবার স্বজনদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছে।
পুলিশ বলছে, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
একটি নিষ্পাপ শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ফলিমারী। কিন্তু সেই ক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে আতঙ্কে। শোক, ক্ষোভ, গ্রেপ্তারের ভয় আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পুরো গ্রামের মানুষের। নন্দিনীর পরিবারের একটাই প্রত্যাশা হত্যার সুষ্ঠু বিচার হোক, আর স্বাভাবিক হোক জনপদের জীবন।
মন্তব্য করুন