বিশ্ব অর্থনীতি এক নীরব কিন্তু গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে এটি প্রযুক্তির নয়, এটি মানুষের বিশেষ করে কর্মশক্তির বয়সগত বিন্যাস এখন কেবল একটি জনমিতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি কৌশলগত বাস্তবতা। উন্নত বিশ্বে যেখানে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতায় একদিকে তরুণ জনসংখ্যার আধিক্য, অন্যদিকে দ্রুত বেড়ে ওঠা অভিজ্ঞ কর্মীশক্তি। এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ নয়, বরং একটি বিরল সুযোগ যদি আমরা এটিকে বুঝতে এবং কাজে লাগাতে পারি।
দীর্ঘদিন ধরে কর্পোরেট চিন্তায় বয়সকে একটি “সমস্যা” হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে একটি অদৃশ্য পক্ষপাত কাজ করে—তরুণ মানেই দ্রুত, উদ্ভাবনী, অভিযোজনক্ষম; আর বয়স্ক মানেই ধীর, অনমনীয়, পরিবর্তনে অনাগ্রহী। এই ধারণা শুধু অযৌক্তিক নয়, এটি বিপদজনক। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে অদৃশ্য করে দেয় তা হলো অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ভুল ধারণার প্রভাব আরও তীব্র। এখানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনও কাঠামোগতভাবে বয়সভিত্তিক স্তরবিন্যাসে পরিচালিত হয়। সিনিয়ররা সিদ্ধান্ত নেন, জুনিয়ররা তা বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু এই একমুখী প্রবাহ আজকের জটিল, অনিশ্চিত ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আর কার্যকর নয়। এখন প্রয়োজন দ্বিমুখী শেখার যেখানে অভিজ্ঞতা এবং নতুন চিন্তা একে অপরকে সমৃদ্ধ করবে।
অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি এই প্রেক্ষাপটে একটি বিপ্লবী ধারণা। এটি আমাদের শেখায় যে, দক্ষতা শুধু সার্টিফিকেট বা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ, অনিশ্চয়তার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া, এবং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জ্ঞান প্রয়োগ করার ক্ষমতা—এসবই উচ্চমূল্যের দক্ষতা, যা সময় এবং অভিজ্ঞতার সাথে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং, গার্মেন্টস কিংবা উন্নয়ন খাতে আমরা বারবার দেখেছি সংকটের সময় অভিজ্ঞ হাতই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখে। অথচ আমরা এই অভিজ্ঞতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই।
একই সঙ্গে, আমাদের কর্পোরেট সংস্কৃতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রজন্মকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা। তরুণ কর্মীরা মনে করেন, সিনিয়ররা তাদের সুযোগ আটকে রাখছেন; সিনিয়ররা মনে করেন, তরুণরা যথেষ্ট ধৈর্যশীল বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। এই মানসিকতা একটি “জিরো-সাম” সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে সহযোগিতার জায়গা সংকুচিত হয়। অথচ বৈশ্বিক গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে সবচেয়ে উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো বয়সভিত্তিক বৈচিত্র্যকে প্রতিযোগিতা নয়, বরং পরিপূরকতা হিসেবে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের আইটি ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে আমরা এই সম্ভাবনার আভাস দেখতে পাই। তরুণরা প্রযুক্তিতে দক্ষ, ঝুঁকি নিতে আগ্রহী, এবং দ্রুত নতুন ধারণা গ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে, অভিজ্ঞ কর্মীরা বাজারের বাস্তবতা বোঝেন, সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন, এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণে পারদর্শী। যদি এই দুই শক্তিকে কৌশলগতভাবে একত্র করা যায় যেমন রিভার্স মেন্টরিং, ক্রস-ফাংশনাল টিম বা কো-লিডারশিপ মডেলের মাধ্যমে—তাহলে উদ্ভাবন শুধু ত্বরান্বিতই হবে না, তা টেকসইও হবে।
তবে এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় বাধা হলো—প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সংরক্ষণের অভাব। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনও ব্যক্তি-নির্ভর। কোনো অভিজ্ঞ কর্মী অবসর নিলে তার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠান হারায় বছরের পর বছর জমে থাকা অদৃশ্য জ্ঞান যা কোনো ম্যানুয়াল বা ডাটাবেজে লেখা থাকে না। এই “ট্যাসিট নলেজ” হারানো মানে শুধু একজন কর্মী হারানো নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি হারানো।
এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। মেন্টরশিপকে ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক করতে হবে। পারফরম্যান্স মেট্রিকের মধ্যে জ্ঞান হস্তান্তরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে, ধাপে ধাপে অবসর গ্রহণের মতো নীতিমালা চালু করতে হবে, যাতে অভিজ্ঞ কর্মীরা হঠাৎ করে সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে জ্ঞান স্থানান্তরের একটি সেতু হিসেবে কাজ করতে পারেন।
নেতৃত্বের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতাদের প্রথম কাজ হলো নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তন করা। বয়সকে “দুর্বলতা” বা “শক্তি” হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে একটি বৈচিত্র্য হিসেবে দেখতে হবে, যার প্রতিটি স্তরের নিজস্ব মূল্য আছে। একই সঙ্গে, একটি “লার্নিং কালচার” তৈরি করতে হবে, যেখানে বয়স নির্বিশেষে সবাই শিখতে এবং শেখাতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি সাংগঠনিক কৌশল নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। আমরা যদি আমাদের জনসংখ্যাগত সুবিধাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে তা একসময় বোঝায় পরিণত হবে। কিন্তু যদি আমরা তরুণদের উদ্যম এবং প্রবীণদের প্রজ্ঞাকে একত্র করতে পারি, তাহলে এটি আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
অতএব, সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর। বয়স কোনো সীমা নয়; এটি একটি স্তর, একটি সম্পদ, একটি সম্ভাবনা। প্রশ্নটি আর “কিভাবে আমরা বয়স্ক কর্মীদের মানিয়ে নেব?” নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, “কিভাবে আমরা প্রতিটি বয়সের শক্তিকে একত্রিত করে এমন একটি কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলব, যা উদ্ভাবন, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কেবল একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবেই থাকবে, নাকি একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জ্ঞাননির্ভর শক্তিতে পরিণত হবে।
মন্তব্য করুন