
২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসার কথা। স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দীরও কম সময়ে এই অর্জন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এই অবস্থানে পৌঁছেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এলডিসি থেকে উত্তরণ কি কেবল একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি, নাকি এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি কঠিন পরীক্ষার সূচনা?
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: বাংলাদেশ কি সত্যিই এলডিসি পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘ নির্ধারিত তিনটি সূচক—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক সফলভাবে পূরণ করেছে। এই অর্জন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন। তবে উন্নয়নের এই স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ হারাতে যাচ্ছে বেশ কিছু বিশেষ আন্তর্জাতিক সুবিধা, যা গত কয়েক দশক ধরে দেশের রপ্তানি ও শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বাণিজ্য সুবিধা হারানো। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে। এলডিসি উত্তরণের পর এসব সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে তৈরি পোশাক খাতের ওপর, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।
আঙ্ক টাড-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ আরও উদ্বেগজনক একটি চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, বাণিজ্য সুবিধা ক্ষয় হলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয়ের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা সম্ভাব্যভাবে মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান।
এই পরিসংখ্যানকে শুধু একটি অর্থনৈতিক সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রপ্তানি বৈচিত্র্যের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন অথবা নতুন প্রতিযোগীদের উত্থান বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে এলডিসি উত্তরণের আগে কি বাংলাদেশ পর্যাপ্তভাবে নতুন শিল্পখাত গড়ে তুলতে পেরেছে?
তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হলেও রপ্তানি কাঠামোতে এখনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ফলে এল ডি সি -পরবর্তী যুগে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হবে না।
শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ পরিবেশও একটি বড় প্রশ্ন। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত পাঠাতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনা করেন—নীতিগত স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘসূত্রিতার মতো সমস্যার মুখোমুখি। ইউএনডিপি, আঙ্কটাড এবং বিডা-এর সাম্প্রতিক আলোচনাতেও এলডিসি -পরবর্তী যুগে বিনিয়োগ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণ ও অর্থায়ন। এলডিসি মর্যাদার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পসুদে উন্নয়ন সহায়তা ও বিশেষ অর্থায়নের সুবিধা পেয়েছে। উত্তরণের পর ধীরে ধীরে এসব সুবিধা কমতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারভিত্তিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এর ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রস্তুতি। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের গ্রাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্টে এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করলেও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখনও দুর্বলতা রয়েছে। প্রতিবেদনে বাণিজ্য সুবিধা হারানো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণ নিজে কোনো গন্তব্য নয়; এটি একটি নতুন যাত্রার শুরু। ইতিহাস বলছে, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পরও অনেক দেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে গেছে। আবার কিছু দেশ এই সুযোগকে ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সেই সিদ্ধান্তের মুহূর্ত।বর্তমান বিতর্কে অনেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে, আবার অনেকে নির্ধারিত সময়েই এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। কিন্তু মূল প্রশ্নটি সময়সূচি নয়; মূল প্রশ্ন হলো প্রস্তুতি।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে চারটি বিষয়ে: রপ্তানি বৈচিত্র্য, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি অর্জন, কিন্তু অর্জনকে টেকসই সাফল্যে রূপান্তর করা আরও কঠিন কাজ। যদি বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরকে কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে এই উত্তরণ নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু যদি সংস্কার বিলম্বিত হয়, তাহলে এই অর্জনই নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, প্রশ্নটি আর “বাংলাদেশ কি এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে?” নয়। প্রশ্নটি হলো—“বাংলাদেশ কি এলডিসি পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত?”
মন্তব্য করুন