
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর কামারপাড়া গ্রামের ১৪ বছর বয়সী কিশোর অপূর্ব চন্দ্র রায়। যে বয়সে মাঠে সহপাঠীদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই তার হাতে উঠেছে মুদি দোকানের ক্যাশবক্স। লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চার মাস আগে বাবা সানু ভুষণ রায় মারা যাওয়ার পর, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অপূর্বর কাঁধে এসে চেপেছে পুরো সংসারের ভার।
এক লড়াকু পরিবারের গল্প
অপূর্বের মা শ্যামলী রানি জানান, স্বামীর চিকিৎসার জন্য গত দেড় বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভিটে-মাটি হীন এই পরিবারের জমানো সবটুকু অর্থ শেষ করেও শেষ রক্ষা হয়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর অভাব যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে তাদের। শ্যামলী রানি বাড়িতে সেলাই মেশিনে কাজ করে যা পান, আর অপূর্ব মুদি দোকান চালিয়ে যা আয় করে, তা দিয়েই চলছে মা ও দুই সন্তানের জীবনযুদ্ধ।
”আমার কোনো জমিজমা নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের সব দায়িত্ব ছেলের কাঁধে। আমি সেলাই করে যা পাই, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। কিন্তু কষ্ট হলেও চাই আমার ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করে বড় অফিসার হোক।” — কথাগুলো বললেন শ্যামলী রানি, অপূর্বর মা।
পড়াশোনা আর সংগ্রামের দ্বৈরথ
অপূর্ব ও তার ছোট বোন নীলা রানি দুজনেই মেধাবী ছাত্র। অপূর্ব তারাগঞ্জের সায়েন্স ল্যাব স্কুলের সপ্তম শ্রেণি এবং নীলা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রতিদিন সকালে স্কুলে গেলেও দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত অপূর্বকে বসতে হয় বাবার রেখে যাওয়া সেই মুদি দোকানে।
অপূর্ব জানায়, “বাবা মারা যাওয়ার পর দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এলাকার মানুষের সাহায্যে আবার চালু করেছি। এখন আর খেলার সময় পাই না। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত দোকানেই কাটে।”
মানবিক সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন
এই অসহায়ত্বের খবর জানতে পেরে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেন তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাব্বর হোসেন। মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে তিনি ওই পরিবারকে নিজ দপ্তরে ডেকে পাঠান।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া পদক্ষেপসমূহ:
১. পরিবারটিকে জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ হাজার টাকার চেক প্রদান।
২. শ্যামলী রানিকে দ্রুত বিধবা ভাতার আওতায় আনার জন্য সমাজসেবা অফিসকে নির্দেশ।
৩. দুই সন্তানের সরকারি স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করা এবং উপবৃত্তির ব্যবস্থা।
ইউএনও মোনাব্বর হোসেন জানান, পরিবারটির পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিতে উপজেলা প্রশাসন সব সময় তাদের পাশে থাকবে।
অভাবের আঁধারে এই সরকারি সহায়তা যেন অপূর্বর ঝিমিয়ে পড়া স্বপ্নে নতুন করে আশার আলো জুগিয়েছে। শৈশব হারিয়ে গেলেও, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প এখন এই খুদে যোদ্ধার চোখে-মুখে।
মন্তব্য করুন