
আজ বুধবার, সফর মাসের শেষ দিন। মুসলিম সমাজে দিনটি ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নামে পরিচিত। আরবি ‘আখেরি’ অর্থ শেষ এবং ফারসি ‘চাহার সোম্বা’ অর্থ শেষ বুধবার। অর্থাৎ, সফর মাসের শেষ বুধবারকেই আখেরি চাহার সোম্বা বলা হয়।
বাংলাদেশে দিনটি ধর্মীয়ভাবে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকাতেও স্থান পেয়েছে। তবে এ দিবসের ধর্মীয় ভিত্তি, প্রচলিত আচার এবং ইসলামী শরিয়তে এর বিশেষ মর্যাদা আছে কি না—এসব বিষয়ে আলেম ও ইসলামি গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
আখেরি চাহার সোম্বার প্রচলিত ইতিহাস
মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় কোনো এক পর্যায়ে সাময়িক সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। তাঁর সুস্থতার সংবাদে সাহাবায়ে কেরাম আনন্দিত হন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন—এমন কথা বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই ঘটনার স্মরণে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষভাবে পালন করার রীতি কিছু মুসলিম সমাজে গড়ে ওঠে।
কেউ কেউ এ দিনকে দান-সদকা, নফল নামাজ, দোয়া, জিকির ও মোনাজাতের মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় আলোচনা ও মিলাদ মাহফিলেরও আয়োজন দেখা যায়।
তবে এসব আমলকে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’র জন্য নির্দিষ্ট ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইতিহাসের সঙ্গে ধর্মীয় দাবির পার্থক্য
ইসলামি ইতিহাস ও হাদিসের বিভিন্ন সূত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময়কাল নিয়ে একাধিক বর্ণনা রয়েছে। অসুস্থতা শুরু হওয়ার দিন, কতদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কোন সময়ে সাময়িক সুস্থতা অনুভব করেছিলেন—এসব বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্নতা পাওয়া যায়।
এ কারণে সফর মাসের শেষ বুধবারকেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুস্থতার নির্দিষ্ট দিন হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা নিয়ে ইসলামি গবেষকদের একটি অংশ আপত্তি জানিয়েছেন।
বিশেষ করে তাঁর শেষ অসুস্থতা ছিল ইন্তেকালের পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনা। তাই সপ্তম হিজরিতে সংঘটিত জাদুর ঘটনার সঙ্গে তাঁর ইন্তেকালের আগের অসুস্থতাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই—এমন মতও দিয়েছেন গবেষক আলেমরা।
সাহাবায়ে কেরাম কি দিনটি পালন করেছিলেন?
আখেরি চাহার সোম্বাকে ধর্মীয় উৎসব বা বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম কি প্রতিবছর এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করেছিলেন?
এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় না। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগেও দিনটিকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে পালনের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এ কারণে আলেমদের একটি অংশ মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ সওয়াবের ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করতে হলে কোরআন-সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন কোনো আমল করা হলে যার অনুমোদন ইসলামে নেই, তা গ্রহণযোগ্য নয়—এই মর্মে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হাদিস রয়েছে।
তাহলে এ দিনে কী করা যেতে পারে?
ইসলামে আল্লাহর ইবাদত, দান-সদকা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও নফল ইবাদত সবসময়ই সওয়াবের কাজ। তবে এগুলোকে শুধু আখেরি চাহার সোম্বার জন্য নির্ধারিত বিশেষ আমল মনে না করে সাধারণ নফল ইবাদত হিসেবে করা যেতে পারে।
বিশেষ কোনো দিনকে কেন্দ্র করে এমন কোনো আমলকে সুন্নত বা আবশ্যিক মনে করা উচিত নয়, যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। এ ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকায় ব্যক্তিগত আমল নির্ধারণে গ্রহণযোগ্য ও জ্ঞানী আলেমদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
জাতীয় জীবনে এর প্রভাব
বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে আখেরি চাহার সোম্বা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে পরিচিত একটি দিন। এ উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের দৈনন্দিন কর্মসূচিতে সাময়িক পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন হয়ে থাকে।
তবে জাতীয় জীবনে এ দিনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হতে পারে—ধর্মীয় আবেগকে মানবিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্রদের সহায়তা করা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া এবং সমাজে নৈতিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ ইসলামের সার্বজনীন শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, যাচাই না করা ইতিহাস বা দুর্বল বর্ণনাকে নিশ্চিত ধর্মীয় সত্য হিসেবে প্রচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই ধর্মীয় সংবাদ ও বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে কোরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামি গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আজকের দিনে করণীয়
আখেরি চাহার সোম্বাকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত বা প্রমাণহীন কোনো আমলকে বাধ্যতামূলক মনে না করে একজন মুসলমান তার স্বাভাবিক ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, তওবা, জিকির এবং দান-সদকা ইসলামে স্বীকৃত নেক আমল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং ধর্মীয় কোনো বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান না থাকলে যাচাই ছাড়া তা প্রচার না করা।
সুতরাং, আখেরি চাহার সোম্বা মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দিবস হলেও এর বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা ও নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একজন সচেতন মুসলমানের জন্য উত্তম হলো, সহিহ দলিলনির্ভর ইবাদত করা, মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখা এবং ধর্মীয় আবেগকে মানবকল্যাণে কাজে লাগানো।
মন্তব্য করুন