
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সদস্য ও বোয়ালমারী কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মজনু মিয়ার বিরুদ্ধে ভুয়া চিকিৎসা সনদ দাখিল, হাজিরা খাতায় জালিয়াতি এবং সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর সময় গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। পরে কলেজে ছুটির আবেদন জমা দিতে গিয়ে ২০০৮ সালে অবসরে যাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শাহজাহান বিশ্বাসের নাম ও পদবি ব্যবহার করে একটি চিকিৎসা সনদ দাখিল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসা সনদটিতে বাংলা ও ইংরেজি মিশ্রিত দুটি ভিন্ন তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ‘মেডিসিন’ বিভাগের সনদ ব্যবহার করলেও রোগের প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয় চক্ষু পরীক্ষার কিছু কাগজপত্র। এমনকি সংশ্লিষ্ট ছুটির আবেদনপত্রেও কোনো তারিখ উল্লেখ ছিল না।
চিকিৎসা সনদের প্যাডে উল্লেখিত ঢাকার মিরপুর-১ এলাকার ‘বিসমিল্লাহ ফার্মেসি’তে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এমন কোনো সনদ দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোনো অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসা কর্মকর্তা এ ধরনের সনদ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এক মাসের বেশি সময় অনুপস্থিত থাকার পরও মজনু মিয়া গত ১ জুলাই ছয় মাস আগের একটি ছুটির আবেদন ও চিকিৎসা সনদ জমা দেন। তিনি ১৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত নয় দিনের ছুটির আবেদন করলেও বাকি সময়ের উপস্থিতি দেখাতে হাজিরা খাতায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় অনুসন্ধানে গিয়ে সংবাদকর্মীরা জানতে পারেন, গত ১৩ জুলাই কলেজে উপস্থিত হয়ে তিনি হাজিরা খাতার ফাঁকা স্থানে স্বাক্ষর করে অনুপস্থিতির সময় বৈধ করার চেষ্টা করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও মজনু মিয়া বোয়ালমারীর বড়গা বাজারে কীটনাশক ও সারের ব্যবসা এবং ওয়াপদা মোড়ে একটি ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক আর্থিক সুবিধাভোগী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই শিক্ষা কার্যক্রমের চেয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড ও ব্যবসায় বেশি সময় ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে কলেজের প্রায় সাত লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তিনি ওই অর্থ কলেজ তহবিলে ফেরত দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মুজিব শতবর্ষ উদ্যাপন, জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সংবর্ধনা এবং পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচিতে কলেজের অর্থ অপচয় করা হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে কলেজে আর্থিক সংকট দেখা দেয় এবং নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের কারণে কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ মজনু মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
মন্তব্য করুন