
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার চর মানিকহার আদর্শ গ্রামের বাসিন্দারা সরকারি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় আবাসন সুবিধা পেলেও জীবিকা, নিরাপদ পানি, চিকিৎসা ও দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে এখনো নানা সংকটের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৯ জন শিক্ষার্থীর একটি গবেষক দল আদর্শ গ্রামের ১৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত মাঠকর্মে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, আদর্শ গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী সদস্যরা দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নাপিত, বাবুর্চি বা খামার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পরিবারগুলোর গড় সদস্য সংখ্যা ৪ থেকে ৫ জন। নারীদের একটি বড় অংশ গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি অন্যের বাড়িতে কাজ কিংবা দর্জি পেশার সঙ্গে যুক্ত।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলো জানায়, বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় ও খরা এ অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দুর্যোগের সময় কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় তাদের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘরে পানি প্রবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে খাদ্য সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং চিকিৎসা সেবার সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাসিন্দাদের নিজস্ব কিছু কৌশলও রয়েছে। অধিকাংশ পরিবার জরুরি সময়ে স্থানীয় মহাজন বা এনজিও থেকে ঋণ নেয়, কেউ কেউ সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করে। মূল পেশা ব্যাহত হলে বিকল্প হিসেবে নৌকা চালানো, জাল বোনা কিংবা শহরে গিয়ে দিনমজুরির কাজ করেন অনেকে। বন্যার পানি থেকে রক্ষা পেতে ঘরের চারপাশে মাটি ফেলে উঁচু করার মতো উদ্যোগও দেখা যায়।
তবে গবেষণায় উঠে এসেছে নানা সীমাবদ্ধতার চিত্র। বিশুদ্ধ পানির সংকট, মাদকসেবীদের আড্ডা, চুরি ও নিরাপত্তাহীনতা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব, দুর্যোগকালীন সরকারি-বেসরকারি সহায়তার স্বল্পতা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অনুপস্থিতি বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যার মধ্যে অন্যতম। এছাড়া দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং প্রশিক্ষণের অভাবও তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তোলে।
অন্যদিকে আদর্শ গ্রামে বসবাসের ফলে বাসিন্দারা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও পেয়েছেন। তাদের অনেকেই স্থায়ী ঠিকানা, সরকারি ঘর, বিদ্যুৎ ও টিউবওয়েল সুবিধা পেয়েছেন। প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য কোনো না কোনো আয়মূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের মাধ্যমে অনেক পরিবার দুর্যোগের পূর্বাভাস সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
মানিকহার আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা গৃহিণী সুমি খাতুন বলেন, “আমাগো এই আদর্শ গ্রামে থাকতি ১৬ বছর হইছে। আমার স্বামী রাজমিস্ত্রির কাম করে। মাসে ১০ হাজার টাকারও কম ইনকাম হয়। ঘূর্ণিঝড় আর খরা আমাগো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এই সময় কামকাজ কমে যায়, খাওনের কষ্ট হয়, বিশুদ্ধ পানির অভাব হয়, বাচ্চাগো চিকিৎসা করাইতে সমস্যা হয়। অনেক সময় না খাইয়াও দিন কাটাইতে হইছে। দুর্যোগের সময় কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্যও পাই না।”
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে গবেষক দল উল্লেখ করেছে, মানিকহার আদর্শ গ্রামের বাসিন্দারা কাঠামোগতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক সংহতির মাধ্যমে তারা দুর্যোগ মোকাবিলার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত পুঁজি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তাদের স্থিতিস্থাপকতা এখনো টেকসই হয়ে ওঠেনি। দুর্যোগ-পরবর্তী ঋণগ্রস্ততা অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের চক্রকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
গবেষক দল সুপারিশ করেছে, বিকল্প আয়ের জন্য প্রশিক্ষণ ও সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল আবাসন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু আবাসন প্রদান করলেই প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আবাসনের পাশাপাশি জীবিকার নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা এবং মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে পারলেই আদর্শ গ্রামের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।
মন্তব্য করুন