
বাম্পার ফলনের আনন্দ এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিদের জীবনে। বাজারে আলুর দাম না বাড়া, উৎপাদন খরচ লাগাম হীন বৃদ্ধি, হিমাগার ভাড়া, পরিবহন ব্যয় আর এসব কিছুর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আলু পচে নষ্ট হওয়ার দুর্ভোগ।
বাড়িতে ও হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলুতে পচন ধরায় প্রতিদিনই কৃষকদের পচা আলু ফেলে দিতে হচ্ছে। এতে লোকসানের অঙ্ক আরও দীর্ঘ হচ্ছে। চরম হতাশায় অনেক কৃষক এখন প্রকাশ্যেই বলছেন “আর আলু চাষ করবো না।”
রংপুর অঞ্চলের কৃষকেরা জানান, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ১৪ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা কেজি দরে।এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমাগার ভাড়া,শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়,ফলে মৌসুমে কম দামে আলু বিক্রি না করে যারা ভবিষ্যতে বেশি দামের আশায় সংরক্ষণ করেছিলেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।
কৃষকরা জানান, এবারের মৌসুমে অসময়ের বৃষ্টিতে অনেক আলুখেত পানিতে তলিয়ে যায়। ভেজা অবস্থায় আলু সংরক্ষণ করায় দ্রুত পচন ধরছে। বাড়িতে সংরক্ষণ করা আলুতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। আবার হিমাগারে রাখা আলুতেও পচন দেখা দিচ্ছে।
লালমনিরহাট মহেন্দ্রনগর এলাকার কৃষক শরিফুল (৫৫) প্রতি শতাংশ জমিতে তার আলু উৎপাদন হয়েছে ১১০ কেজি। উৎপাদন ব্যয় হয়েছে প্রতি শতাংশে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১৫ টাকা।
মৌসুমে মার্চ মাসে তিনি ১৫ হাজার কেজি আলু ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছিলেন। ৫ হাজার কেজি রেখেছিলেন হিমাগারে এবং বাকি ৭ হাজার ৫০০ কেজি বাড়িতে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বাড়িতে রাখা আলুর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ কেজি পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট আলুও বিক্রি করতে হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা কেজি দরে।
মোগলহাট ইউনিয়নের সোহরাব হোসেন বলেন, মৌসুমে আলু বিক্রি করেও লোকসান হয়েছে। দুই মাস পর বিক্রি করতে গিয়ে আরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে। বাড়ির আলু পচে গেছে, হিমাগারের আলুতেও পচন ধরেছে,হিমাগারের ভাড়া হয়তো উঠবে না।এবার অসময়ের বৃষ্টিতে খেতের আলু পানিতে ভিজে গিয়েছিল। পরে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করলেও শেষ পর্যন্ত পচন ঠেকানো যায়নি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোস্তফি গ্রামের কৃষক বুলবুল আহমেদ (৫০) এবছর ৩০০ শতাংশ জমি থেকে ৩৩ হাজার ৬০০ কেজি আলু উৎপাদন করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু মৌসুমে বাজারদর কম থাকায় তিনি মাত্র ১ হাজার ৬০০ কেজি আলু ৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছিলেন।
তিনি বাকি ৩২ হাজার কেজি আলু হিমাগারে রাখতে চাইলেও জায়গা না থাকায় মাত্র ১১ হাজার কেজি সংরক্ষণ করতে পেরেছেন। অবশিষ্ট ২১ হাজার কেজি বাড়িতে প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষণ করেন। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার কেজি আলু পচে নষ্ট হয়েছে।
রংপুর দেওতি হাটের বুলবুল আহমেদ বলেন, মৌসুমে সব আলু বিক্রি কর দিলে অন্তত পঁচে যেত না। দুই মাস ধরে আলু রেখে কম দামেই এখন বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি, উপরন্তু পচন ধরায় লোকসান আরও বেড়েছে, আলুচাষ করে চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়েছি।
পাইকারি ব্যবসায়ী নুরজামাল হক বলেন, “বৃষ্টির পানিতে ভেজা আলু সংরক্ষণ করায় এখন পচন দেখা দিয়েছে। কৃষকের বাড়ি থেকে শুরু করে অনেক হিমাগারেও আলু পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।”
তিনি জানান, নিজেও প্রায় ৮০ হাজার কেজি আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছেন এবং এবার বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৬ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন।
এই অঞ্চলে মোট ১১৫টি হিমাগার রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় ৭৮ শতাংশ আলু কৃষকদের বাড়িতে বিভিন্ন উপায়ে সংরক্ষণ করতে হয়েছে। হিমাগারে প্রতিকেজি আলু সংরক্ষণে ব্যয় হয় ৬ দশমিক ২৫ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে আলু উৎপাদনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৭৬৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। হিমাগার ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়েছে আরও ১০৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ৫ শতাংশ আলু পচে নষ্ট হওয়াতেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা। বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করায় রংপুর অঞ্চলের কৃষকেরা এবছর প্রায় ৩ হাজার ৬৯১ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রংপুর হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ভারত ও পাকিস্তানে আলু উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের চেয়ে কম হওয়ায় ওই দেশেগুলো আলু রপ্তানির বাজার ধখল করে রেখেছে। বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় আলু রপ্তানির প্রতিযোগিতায় ব্যবসায়ীরা টিকতে পারে না।
তিনি বলেন, “আলুর উৎপাদন খরচ কমানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না। কৃষক যাতে বীজ, সার ও কীটনাশকে প্রতারিত না হন, সেজন্য সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় কৃষক মারাত্মক লোকসানে পড়েছেন। এর ওপর বাড়িতে সংরক্ষণ করা আলুতে পচন ধরায় ক্ষতি আরও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে আলু রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো না গেলে উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন না। এতে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক আলুচাষ থেকে সরে যেতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মন্তব্য করুন