
শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলার বিচার মাত্র ২৯ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার আশ্বাস জনমনে ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এত অল্প সময়ে একটি হত্যা মামলার বিচার শেষ করা কতটা বাস্তবসম্মত?
বাংলাদেশে অতীতে বেশ কয়েকটি আলোচিত মামলার বিচার তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২৪ অক্টোবর আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। অর্থাৎ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ২০০ দিন সময় লেগেছিল।
এছাড়া সিলেট এমসি কলেজে গৃহবধূ ধর্ষণ মামলায় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘটনা ঘটার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে রায় ঘোষণা করা হয়। সে ক্ষেত্রে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হতে প্রায় ১২০ দিনের বেশি সময় লেগেছিল।
অন্যদিকে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৬ জুন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়। এ মামলার বিচার সম্পন্ন হতে প্রায় ১৫ মাস সময় লেগেছিল।
এসব মামলা দেশে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হলেও কোনোটিই ২৯ দিনের মধ্যে শেষ হয়নি। কারণ একটি হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করতেই সাধারণত উল্লেখযোগ্য সময় লাগে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ আগে থেকেই সংগ্রহ করা থাকে, আসামিরা গ্রেপ্তার অবস্থায় থাকে এবং আদালত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে টানা শুনানি পরিচালনা করে, তাহলে বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত বিচারিক বাস্তবতায় একটি হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার মাত্র ২৯ দিনের মধ্যে শেষ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
জনগণের প্রত্যাশা শুধু দ্রুত বিচার নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও টেকসই বিচার নিশ্চিত করা। কারণ বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার তাড়নায় যদি আইনি প্রক্রিয়ার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ উপেক্ষিত হয় বা ত্রুটি থেকে যায়, তাহলে উচ্চ আদালতে আপিলের সময় মামলাটি জটিল হয়ে পড়তে পারে। ফলে চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে,শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে বিচার যেন আইনের সকল বিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন হয় এবং অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত বিচারের চিত্র
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তবে “দ্রুত বিচার” বলতে সব দেশে একই সময়সীমা বোঝায় না। মামলার ধরন, প্রমাণের জটিলতা, বিচারিক কাঠামো এবং আপিলের সুযোগের ওপর ভিত্তি করে বিচার সম্পন্নের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে।
সিঙ্গাপুরে সাধারণ ফৌজদারি মামলাগুলো প্রায় ৩০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হতে পারে। বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় সময় আরও কম লাগার নজির রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় অধিকাংশ ফৌজদারি মামলার বিচার ২ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। দেশটির উন্নত ডিজিটাল বিচারব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জাপানে গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোর প্রথম ধাপের বিচার সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। তদন্ত পর্যায়ে দীর্ঘ প্রস্তুতি গ্রহণের ফলে আদালত পর্যায়ে সময় কম লাগে।
জার্মানিতে হত্যা বা গুরুতর অপরাধের মামলায় সাধারণত ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে প্রমাণ সুস্পষ্ট হলে বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কিছু বিশেষ আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলার বিচার ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার নজির রয়েছে।
চীনে অনেক ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে আদালতের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত থাকে। কিছু মামলায় ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়, যদিও জটিল মামলায় সময়সীমা বাড়তে পারে।
ভারতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের কিছু মামলার বিচার ২ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে সাধারণ মামলাগুলোতে বিচার দীর্ঘ সময় ধরে চলার ঘটনাও ব্যাপক।
বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী নজির
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি নজির সৃষ্টি হয় মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় শিশু ধর্ষণ মামলায়। ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত শাকিল হোসেনের বিরুদ্ধে মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। দেশের বিচারিক ইতিহাসে এত কম সময়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদানের ঘটনা অন্যতম দ্রুততম বিচার হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। অধিকাংশ হত্যা ও গুরুতর ফৌজদারি মামলায় তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে এত দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।
শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলার বিচার ২৯ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার ঘোষণা জনমনে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে অতীতের বিচারিক অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় এটি একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। দ্রুত বিচার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
সুষ্ঠু তদন্ত, শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য। কারণ বিচার শুধু দ্রুত হলেই যথেষ্ট নয়; বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং টেকসই।
মন্তব্য করুন