
দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে প্রতিদিন ৭৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা নোয়াখালীর চাটখিল মহিলা ডিগ্রি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মফিদুল আলম আরজু আর নেই। সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর।
সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে চাটখিল মহিলা ডিগ্রি কলেজে যোগদানের পর থেকে তিনি নিয়মিত বাড়ি থেকে কলেজে যাতায়াত করে ক্লাস নিতেন। তাঁর বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব ছিল ৩৮ কিলোমিটার। প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় মোট ৭৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েও তিনি কখনো দায়িত্বে অবহেলা করেননি। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন কর্মনিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ।
পারিবারিক সূত্র জানায়, হঠাৎ শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আত্মীয়ের বাসায় অবস্থানকালে তিনি আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই মারা গেছেন।
বুধবার ভোরে তাঁর মরদেহ নোয়াখালী সদর উপজেলার জেলা বোর্ড কলোনির বাসভবনে পৌঁছালে সেখানে সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একমাত্র ছেলে আবতাহি উদ্দিন লাবিব বাবার মরদেহ ঘরে রেখেই এসএসসি পরীক্ষার শেষ দিনে জীববিজ্ঞান পরীক্ষায় অংশ নেয়। নোয়াখালী জিলা স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিব বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেও স্বজন ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় পরীক্ষাকেন্দ্রে যায়। বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে চরম মানসিক কষ্ট নিয়েই সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
সহজ ও সাবলীল পাঠদানের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন মফিদুল আলম আরজু। কলেজের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানান, কঠিন পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়ও তিনি অত্যন্ত সহজভাবে বুঝিয়ে দিতেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও তাঁকে কখনো ক্লান্ত মনে হয়নি। সবসময় হাসিমুখে ক্লাস নিতেন তিনি।
মফিদুল আলম আরজুর শিক্ষাজীবনও ছিল কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৮৭ সালে কক্সবাজারের উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৯ সালে কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯৩ সালে বিএসসি (অনার্স) এবং ১৯৯৪ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালের ১ মার্চ তিনি চাটখিল মহিলা ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।
কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “মফিদুল আলম স্যারের মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি শুধু দক্ষ শিক্ষকই ছিলেন না, তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
কলেজ গভর্নিং বডি ও শিক্ষকরা যৌথ শোকবার্তায় বলেন, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ও জনপ্রিয় শিক্ষক। তাঁর মৃত্যুতে কলেজ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত।
বুধবার বাদ জোহর নোয়াখালী কেরামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সহকর্মী, শিক্ষার্থী, স্বজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে জেলা পরিষদ কলোনি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের এমন আকস্মিক প্রস্থান এবং শোকের মাঝেও ছেলের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ঘটনা নোয়াখালীবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে
মন্তব্য করুন