
ঢাকার শহুরে জীবন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে বাজারে যেতে হতো, এখন মুঠোফোনে অর্ডার করলেই পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে দরজায়। খাবারের জন্য রেস্তোরাঁয় যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না, কোথাও যেতে চাইলে অ্যাপেই পাওয়া যাচ্ছে গাড়ি। প্রযুক্তিনির্ভর এসব সেবা নাগরিক জীবনকে অনেকটাই সহজ করেছে।
তবে এই সুবিধার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো আমাদের চোখের আড়ালে—যারা প্রতিদিন রাস্তায় নেমে এসব সুবিধা নিশ্চিত করছেন।
খাবার সরবরাহকারী, রাইড-শেয়ারিং চালক ও পণ্য পৌঁছে দেওয়া কর্মীদের কর্মক্ষেত্র পুরো শহরজুড়ে। অথচ শহরের অবকাঠামো ও নীতিনির্ধারণে তাদের প্রয়োজনীয়তা সবসময় দৃশ্যমান নয়।
ঢাকার রাস্তায় একজন প্ল্যাটফর্ম কর্মীকে একই সঙ্গে সময়ের চাপ, যানজট, বৃষ্টি, অতিরিক্ত গরম, জলাবদ্ধতা এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি সামলাতে হয়। একজন গ্রাহকের কাছে কয়েক মিনিট দেরি হয়তো সামান্য বিরক্তির বিষয়; কিন্তু একজন কর্মীর কাছে সেই দেরি আয়, মূল্যায়ন এবং পরবর্তী কাজ পাওয়ার সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এখানেই প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির একটি মৌলিক বৈপরীত্য তৈরি হয়। প্রযুক্তি সেবাকে দ্রুত ও সহজ করেছে, কিন্তু সেই দ্রুততার ঝুঁকির বড় অংশ রাস্তায় থাকা কর্মীর ওপরই পড়ে।
অ্যাপভিত্তিক কাজ অনেক মানুষের জন্য আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু কাজের সুযোগ আর নিরাপদ কর্মসংস্থান এক বিষয় নয়। একজন কর্মী দুর্ঘটনায় পড়লে তার চিকিৎসা ব্যয় কে বহন করবে? কয়েক দিন কাজ করতে না পারলে তার আয় কীভাবে চলবে? কাজের সময়, বিশ্রাম, দুর্ঘটনা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ধরনের সুরক্ষা থাকবে?
এসব প্রশ্নকে শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি এখন শহুরে জীবনের অবকাঠামোরই একটি অংশ হয়ে উঠছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নও নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। কোথাও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও তাদের জন্য আলাদা সামাজিক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা সুরক্ষার কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও এসব উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকার ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন হলো প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় তাদের বাস্তব চলাচল ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট স্থান, নিরাপদ পার্কিং, পানি ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দুর্ঘটনা ও চিকিৎসা সুরক্ষার ন্যূনতম মান নির্ধারণ করা যেতে পারে। কর্মীদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার কারণে সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখতে হলেও তারা সম্পূর্ণভাবে আয়হীন হয়ে না পড়েন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাজের স্বচ্ছতা। একজন কর্মী কোন ভিত্তিতে কাজ পাচ্ছেন, পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং কোন কারণে তার কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি প্রয়োজন।
প্রযুক্তির অ্যালগরিদম মানুষের জীবিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, অথচ সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি অস্বচ্ছ থাকবে—এটি দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাই নগরনীতির লক্ষ্য শুধু দ্রুততম সেবা নিশ্চিত করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ, ন্যায্য ও টেকসই সেবা ব্যবস্থা তৈরি করা।
এর অর্থ ব্যবসা বা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। বরং এমন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে, নাগরিক দ্রুত সেবা পাবেন এবং কর্মীরাও ন্যূনতম নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
ঢাকার আগামী দিনের নগর অর্থনীতিতে প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই তাদের জন্য কার্যকর নীতিমালা তৈরির সময় এখনই। দুর্ঘটনা সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, বিশ্রাম এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশকে আলাদা কোনো সুবিধা নয়, বরং কাজের ন্যূনতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কারণ একটি শহরের আধুনিকতা শুধু তার প্রযুক্তিতে নয়; সেই প্রযুক্তির সুবিধা যারা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাদের জীবন কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ—তার মধ্যেও আধুনিকতার প্রকৃত মানদণ্ড লুকিয়ে থাকে।
ঢাকার সুবিধার অর্থনীতি তাই শুধু দ্রুত হওয়ার নয়; এটিকে ন্যায্য ও টেকসই হওয়ার অর্থনীতিতেও পরিণত করতে হবে।
মন্তব্য করুন