
কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ এখন মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত এক বছরে এই দুই মহাসড়কে শত শত প্রাণ ঝরেছে, আহত হয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। প্রশ্ন একটাই কবে থামবে এই রক্তস্রোত?
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসেই কুমিল্লা অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে ৮৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৫২৫ জন, আহত ১২১০ জন। গড়ে প্রতিদিন ৩টি দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছেন ২ জন, আহত হচ্ছেন ৫ জন।
শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি টোলপ্লাজা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ১০৪ কিমি অংশেই ৪৬৫টি দুর্ঘটনায় ২৮৪ জন মারা গেছেন, আহত ৫০৯ জন।
কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কেও চিত্র একই। ৬ কিমি দীর্ঘ এই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে অসংখ্য। তবে আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ না হলেও হাইওয়ে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, কুমিল্লা-সিলেট, কুমিল্লা-নোয়াখালীসহ সংযোগ সড়কগুলোতেও মৃত্যুর মিছিল থামছে না।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে শুধু কুমিল্লায় ২০৯টি দুর্ঘটনায় ১৪১ জন মারা গেছেন, আহত ২৫০ জনের বেশি।
১ এপ্রিল ২০২৬: চান্দিনা, নিমসার, চৌদ্দগ্রাম, পোদুয়া, দাউদকান্দিতে আলাদা দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত, আহত ৫ জন। দাউদকান্দিতে সিএনজি অটোরিকশাকে ধাক্কা দিয়ে ২ চালক নিহত। চান্দিনায় কোচিং থেকে ফেরার পথে নবম শ্রেণির ছাত্র তায়িম লরির ধাক্কায় নিহত।
১৪ এপ্রিল ২০২৬ দাউদকান্দিতে চালবোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে ৭ জন নিহত, আহত ৬ জন। ১৩ জন ট্রাকের ওপরে ছিলেন, সবাই চাপা পড়েন।
২ আগস্ট ২০২৫: পোদুয়া বাজার ইউ-টার্নে প্রাইভেটকারকে চাপা দেয় লরি। একই পরিবারের ৪ জন নিহত—ওমর আলী, তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম, ছেলে হাসেম ও কাশেম। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভুল দিক থেকে আসা বাস ও নিয়ন্ত্রণ হারানো লরি একসাথে ধাক্কা দেয়। শুধু এই এক ইউ-টার্নেই চলতি বছর ২০ জন মারা গেছেন।
হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. বেপরোয়া গতি: মোট দুর্ঘটনার ৪০% এর বেশি শুধু অতিরিক্ত গতির কারণে।
২. উল্টো পথে গাড়ি ও অবৈধ ইউ-টার্ন: পথচারী ও যানবাহনের অসাবধানতায় ঘটছে ভয়াবহ সংঘর্ষ।
৩. ফিটনেসবিহীন যান ও লাইসেন্সবিহীন চালক: আইন প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।
৪. অপরিকল্পিত রাস্তা: কুমিল্লার মহাসড়কগুলোতে বাড়তি ট্রাফিকের তুলনায় অবকাঠামো অপর্যাপ্ত। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক এখনো দুই লেনের, চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে।
৫. রাস্তার ওপর বাজার: মহাসড়কের ওপরই বসে হাট-বাজার, পথচারী-যানবাহন মুখোমুখি।
ভবিষ্যতে কী হবে? কী করা দরকার?
বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০২৫ সালের মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
চার লেন সম্প্রসারণ: কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করতে হবে।
-ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট সংস্কার: পোদুয়া বাজারের মতো ২০ জনের প্রাণ নেওয়া ইউ-টার্ন বাতিল করে আন্ডারপাস/ওভারপাস করতে হবে। স্পিড ক্যামেরা, সিসিটিভি, অটোমেটেড চালান সিস্টেম চালু করতে হবে।
কঠোর অভিযান: ফিটনেসবিহীন গাড়ি, নছিমন-করিমন, অটোরিকশা মহাসড়কে নিষিদ্ধ করতে হবে। স্কুল-কলেজে ট্রাফিক সচেতনতা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কথা যখন হচ্ছে, তখন নিরাপদ সড়ক ছাড়া সেই উন্নয়ন অর্থহীন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে আছে একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়ার গল্প।
সরকার, প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক আর সাধারণ মানুষ—সবাইকে একসাথে এগোতে হবে। না হলে কুমিল্লার মহাসড়ক শুধু মৃত্যুর মহাসড়ক হয়েই থাকবে।
মন্তব্য করুন