
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে পুলিশের আশ্বাসে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসছে। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুস সাকিব সজিবের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর বাড়িছাড়া অনেক মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওসি নাজমুস সাকিব সজিব ফলিমারী গ্রামে গিয়ে নারী-পুরুষদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি গ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না এবং সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারবেন।
ওসি বলেন, “আমরা ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করছি। যাদের হাতে লাঠি ও ইট-পাটকেল ছিল, শুধু তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, তাদের কোনোভাবেই ভীত হওয়ার কারণ নেই। কোনো নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না।”
তিনি আরও বলেন, অসাধু ও প্রতারকচক্র পুলিশের নাম ব্যবহার করে কারও কাছে টাকা দাবি করলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে জানাতে হবে। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রবিবার সকাল থেকে গ্রামের অনেক পুরুষ সদস্য বাড়িতে ফিরে স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করেছেন। তবে এখনও আতঙ্কের কারণে বেশ কিছু মানুষ বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন।
ফলিমারী গ্রামের বাসিন্দা নিরোবালা রানী বলেন, “শনিবার রাতে ওসি স্যারের আশ্বাসের পর অনেক পুরুষ রবিবার সকালে বাড়িতে ফিরে এসেছেন। তারা স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করছেন। বাকিরাও ধীরে ধীরে ফিরে আসবেন।”
ভ্যানচালক জিতেন চন্দ্র বর্মণ বলেন, “ঘটনার দিন আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও দর্শক ছিলাম। আমার হাতে কোনো লাঠি বা ইট-পাটকেল ছিল না। ওসি স্যারের আশ্বাস পাওয়ার পর বাড়িতে ফিরে স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করেছি।”
উল্লেখ্য, শিশু নন্দিনী রানী (৭) হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলায় প্রায় তিন হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার পর পুরো গ্রামজুড়ে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে অধিকাংশ পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেলে কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে গ্রামটি।
গ্রামের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ফলিমারী বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বাজারের ২৪টি দোকানের মধ্যে ২২টিই বন্ধ ছিল। কৃষিনির্ভর প্রায় ৪০০ পরিবারের জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে কৃষক হারাধন চন্দ্র বর্মণ বলেন, “নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধারের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ গ্রামে এসেছিল। তাদের অনেককেই আমরা চিনতাম না। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় বহিরাগতদেরই বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। ওসি স্যারের আশ্বাসে আমরা স্বস্তি পেয়েছি। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।”
আদিতমারী থানার ওসি নাজমুস সাকিব সজিব বলেন, “প্রয়োজনে আমি প্রতিদিন রাতে ফলিমারী গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করব। ইতোমধ্যে গ্রামে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে শুরু করেছে। বাজারের প্রায় সব দোকান খুলেছে। যারা নিরপরাধ, তাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পুলিশ তাদের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।”
পুলিশের আশ্বাস এবং প্রশাসনের তৎপরতায় ফলিমারী গ্রামে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে পুরোপুরি আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা।
মন্তব্য করুন