
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক নারী শিক্ষার্থী তাঁর মায়ের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুদের ব্যবসা, চেকের অপব্যবহার এবং আইনি হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে কর্মচারী সমিতি ও ইউনিয়নের কয়েকজন নেতার কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়া, ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী দর্শন বিভাগ ৫১ ব্যাচের শারমিন পূর্নিমা। তাঁর মা জুলাই ২৪ জাগরণী হলের একজন কর্মচারী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রীতিলতা হলের কর্মচারী মো. আফাজ উদ্দিনের কাছ থেকে শারমিন আক্তার পূর্ণিমার মা ২ লাখ টাকা ধার নেন। পরবর্তীতে মূল ২ লাখ টাকাসহ প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা সুদ হিসেবে ২০২২ সালের অক্টোবরের মধ্যে সুদে-আসলে মোট প্রায় ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু টাকা পরিশোধের পরও আফাজ উদ্দিন গ্যারান্টি হিসেবে নেওয়া ব্ল্যাংক চেক ফেরত না দিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই চেক ব্যবহার করে তিনি ৪ লাখ টাকার ‘চেক ডিজঅনার’ মামলা ঠুকে দেন। এর ফলে ভুক্তভোগী কর্মচারীকে জেল খাটতে হয় এবং ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে জামিন নিতে হয়। একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে পরিবার নিয়ে যেখানে তাঁর জীবনযাপন করাই কঠিন, সেখানে এই রূপ আর্থিক ও মানসিক হয়রানি চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কর্মচারী ইউনিয়ন নেতাদের ভূমিকা ও লাঞ্ছনার অভিযোগ
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী পূর্ণিমা জানান, আফাজ উদ্দিন শুধু তাঁর মায়ের সাথেই নয়, আরও অনেক মানুষের সঙ্গে একই ধরনের সুদের ব্যবসা ও প্রতারণা চালিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে বিচার ও সহযোগিতা চেয়ে পূর্ণিমা ও তাঁর মা একাধিকবার ৩য় শ্রেণী কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রহিম, সাধারণ সম্পাদক ফারুক এবং নেতা আনোয়ারের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সাহায্য করার পরিবর্তে উক্ত নেতারা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাঁর মায়ের সঙ্গে অশালীন আচরণ, কুপ্রস্তাব প্রদান এবং হাসাহাসি করে লাঞ্ছিত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সুদের ব্যবsayর নেটওয়ার্ক সচল রাখতে কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রহিম ও সাধারণ সম্পাদক ফারুক দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত আফাজ উদ্দিনকে সুরক্ষা দিয়ে আসছেন।
সাংবাদিক সম্মেলন ও সংবাদ প্রকাশে বাধা
শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, তিনি ন্যায়বিচারের আশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কর্মচারী ইউনিয়ন ও রেজিস্টার অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাননি। শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের শরণাপন্ন হতে চাইলে তাতেও বাধা দেওয়া হয়।
মূল ঘটনা আড়ালের অপচেষ্টা
শিক্ষার্থী পূর্ণিমা জানান, কোনো উপায় না পেয়ে তিনি সেলিম রেজা নামের এক পূর্বপরিচিত ভাইয়ের মাধ্যমে আফাজ উদ্দিনের বাসায় গিয়ে তাকে কর্মচারী অফিসে এসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অনুরোধ জানান। কিন্তু আফাজ উদ্দিন উল্টো মারধরের হুমকি দেন এবং তাঁর ছেলে সোহেল (যিনি ছাত্রলীগ করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে) দিয়ে মারাত্মক ক্ষতির হুমকি দেন।
পরবর্তীতে সেলিম রেজা ঘটনাটি রহিমকে জানালে রহিম নিজেই স্বীকার করেন যে আফাজ ‘ভালো লোক নয়’। অথচ বর্তমানে মূল ইস্যু (সুদের ব্যবসা, প্রতারণা ও শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন) থেকে দৃষ্টি সরাতে এবং অভিযুক্তদের রক্ষা করতে, সহায়তাকারী সেলিম রেজাকেই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভিন্ন খাতে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন উক্ত শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও বিচার দাবি
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে শারমিন আক্তার পূর্ণিমা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ন্যায় ও মানবিকতার ক্ষেত্র। একজন নারী শিক্ষার্থী যদি নিজের মায়ের ন্যায়বিচারের জন্য ঘুরে হুমকি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা বা কৃপা চান না; বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
মন্তব্য করুন