
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ভাঁজে দাঁড়িয়ে দূর থেকে তাকালে যতদূর চোখ যায়, চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। কোথাও ধানের সবুজ গালিচা, কোথাও হলুদ ফুলের সুবাস, আবার কোথাও এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভুট্টা গাছের সারি। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। বলছিলাম বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার পাহাড়ি জনপদের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের কথা। চিরসবুজ এই পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষ শুধু কৃষিকাজ নয়, বরং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ে বসবাসরত মানুষ জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পাহাড়ের আগাছা পরিষ্কার করে আগুনে পোড়ানো হয়। এরপর বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে একই জমিতে ধান, মারফা, ভুট্টা, কুমড়া, তিল, মরিচ, হলুদ, আদাসহ নানা ধরনের শস্য উৎপাদন করা হয়। এক জমিতে একসঙ্গে বিভিন্ন ফসলের চাষই জুম চাষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা পাহাড়ি অঞ্চলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সবজি চাষ ও ফলদ বাগান স্থাপনে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও পাহাড়ি পরিবারগুলোর কাছে এখনো জুম চাষই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জীবিকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়া বিকল্প কৃষি পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, রোয়াংছড়ি সদর থেকে আংজাই পাড়া এলাকায় মূল সড়ক ধরে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলে চোখে পড়ে ছোট-বড় অসংখ্য টিলা। নিরিবিলি পরিবেশে গাড়ির পথ শেষ করে পায়ে হেঁটে টিলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে উঠতে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবুজ গাছপালা, টিলা ঘেরা নিস্তব্ধতা আর শীতল বাতাসের ছোঁয়া পথিককে এনে দেয় প্রশান্তি।

টিলার চূড়ায় উঠলেই দেখা যায় দূরের ছোট ছোট গ্রাম, পাশাপাশি পাইক্ষ্যং মৌজা ও রোয়াংছড়ি মৌজার বিস্তীর্ণ জুম খেত। সেখানে ধান, ভুট্টা, মারফা, মরিচ, হলুদ, আদা, কুমড়াসহ বিভিন্ন জাতের সবজির সমাহার নজর কাড়ে। খেতের মাঝামাঝি স্থানে ছন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি দুটি ঝুপড়ি ঘর দাঁড়িয়ে আছে সাদামাটাভাবে। তবে এই সাধারণ ঘরগুলোই জুমিয়াদের বিশ্রামের আশ্রয়স্থল। সেখানে কয়েক মিনিট বসলে যেন দূর হয়ে যায় পথের সমস্ত ক্লান্তি।
চারপাশের দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা ছড়ায়। আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পাহাড়ের ভাঁজে সবুজ ধানক্ষেত, বাহারি সবজির সমাহার আর পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে জুম খেতগুলো হয়ে উঠেছে নয়নাভিরাম। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়, মন ভরে ওঠে এক অন্যরকম অনুভূতিতে।
জুমের জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই থাকে উৎসবের আমেজ। পাহাড়ি পরিবারগুলো দলবদ্ধভাবে কাজ করে। কেউ গাছ কাটে, কেউ আগুন জ্বালায়, আবার কেউ বীজ ছিটিয়ে দেয়। এই সম্মিলিত শ্রম ও পারস্পরিক সহযোগিতা পাহাড়ি সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তবে জুম চাষকে ঘিরে রয়েছে নানা সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পাহাড় ধসের ঝুঁকি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণের সংকট জুম চাষিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও পাহাড়ের মানুষের কাছে জুম চাষ এখনো জীবন, জীবিকা ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে টিকে আছে।
মন্তব্য করুন