
ধনুটে জলমহাল ইজারা সংক্রান্ত আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে বগুড়ার ধুনটের গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্যরা লাখ লাখ টাকা খরচ করেও জলাশয় থেকে মাছ ধরতে পারছেন না। ফলে ওই সমিতির ২৫টি অসহায় পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে জীবনযাপন করছে। এ পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যরা শুক্রবার বিকেলে জলাশয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
যেভাবে শুরু জটিলতা।
উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গোপালনগর ইউনিয়নের ১৯ একর ৪০ শতক আয়তনের সোনাইডাঙ্গা জলাশয়টি উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি বাংলা ১৪৩৩-১৪৩৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য গত ১৮ ফেব্রুয়ারি গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ১ লাখ ২০ হাজার ৯০৭ টাকায় ইজারা বন্দোবস্ত প্রদান করে।
সমিতির সভাপতি অমূল্য চন্দ্র হাওলাদার জানান, সরকারি ইজারামূল্য পরিশোধ করে বিভিন্ন এনজিও থেকে ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে জলাশয়ে মাছ চাষ শুরু করেন তারা। এরপরই বিরোধের সূত্রপাত ঘটে—গোপালনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি স্বপন হাওলাদার সোনাইডাঙ্গা জলাশয়ের ইজারা বাতিলের দাবিতে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করেন।
বগুড়া জেলা প্রশাসক আপিল কেসটি বাতিল করে গত ১২ মে সোনাইডাঙ্গা জলাশয়ে নিরাপদে মাছ চাষ করার জন্য গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি অমূল্য চন্দ্র হাওলাদারকে আদেশ প্রদান করেন। এরপর গোপালনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি স্বপন হাওলাদার রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে ৫৯/২০২৬ নম্বর আপিল কেস দায়ের করেন। রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় থেকে গত ১১ জুন গোপালনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে ইজারা প্রদানের আদেশ দেওয়া হয়।
এই পাল্টাপাল্টি আদেশের জেরে জলাশয়ের ইজারা নিয়ে দুই সমিতির সদস্যদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি অমূল্য চন্দ্র হাওলাদার রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ৭৮৫৭/২৬ নম্বর একটি রিট পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত বিভাগীয় কমিশনারের আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে দেন।
আদালতের আদেশের পর ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামী গত ১৩ জুলাই গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি অমূল্য চন্দ্র হাওলাদারকে সোনাইডাঙ্গা জলাশয়টি পুনরায় ইজারা প্রদান ও নিরাপদে মাছ চাষ করার অনুমতি দিয়ে চিঠি প্রদান করেন।
তবে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনন্দ হাওলাদার অভিযোগ করেন, ইউএনওর চিঠি দেওয়ার চার দিন পর তাদের মৌখিকভাবে জলাশয় থেকে মাছ ধরতে নিষেধ করা হয়েছে এবং মাছ ধরলে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “মাছ আহরণই আমাদের একমাত্র পেশা। দীর্ঘদিন কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা অর্ধাহারে-অনাহারে জীবনযাপন করছি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, “গোপালনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি হাইকোর্টে আপিল করায় আদালত স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছেন। আমি আদালতের আদেশ অমান্য করতে পারি না। আদালতের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী সোনাইডাঙ্গা জলাশয়টি এখন গোপালনগর পশ্চিমপাড়া সমবায় সমিতির ইজারা বহাল আছে। আমি আগামী রোববার তাদের চিঠি দেব।”
দীর্ঘদিনের এই আইনি জটিলতার অবসান চেয়ে দ্রুত প্রশাসনিক সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারের সদস্যরা, যাতে তারা আবার স্বাভাবিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
মন্তব্য করুন