সাব্বির আহমেদ, জাবি সংবাদদাতা
২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

জাবিতে ‘জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথে আত্মশুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

Share this news with

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ‘জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথে আত্মশুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে আত্মশুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, প্রজ্ঞা অর্জন এবং ইসলামী আধ্যাত্মিক অনুশীলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বুধবার (২২ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সেমিনার কক্ষে ফানাফিল্লাহ’র দরবার এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “তাসাউফ মূলত ইসলামিক মিস্টিসিজম। বিজ্ঞান আমাদের কার্যকারণভিত্তিক জ্ঞান দেয়, কিন্তু মানুষের জানার জগৎ বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অজানাকে উপলব্ধি করতে হলে অন্য এক ধরনের পথের প্রয়োজন হয়। দার্শনিকরা একে প্রজ্ঞার অনুসন্ধান বলেন। তাসাউফ সেই অনুসন্ধানের আরেকটি বাহন, যা আত্মার পরিভ্রমণের মাধ্যমে মানুষকে প্রশান্তির দিকে নিয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “মানুষের মন যুক্তি ও হিসাব-নিকাশে পরিচালিত হলেও হৃদয় পরিচালিত হয় ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। তাসাউফ মানুষকে সেই আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়, যা তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয় অর্জনে সহায়তা করে। বিজ্ঞান যতটুকু জানে, তার বাইরেও যে বিশাল অজানা জগৎ রয়েছে, সেই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মধ্যেই প্রকৃত বিনয় নিহিত।”

উপাচার্য আরও বলেন, “ইসলামিক মিস্টিসিজমে বিশ্বাসী সাধকেরা বাহ্যিক কষ্টে সহজে ভেঙে পড়েন না। দেহ বা মন আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে, কিন্তু আত্মার সুখ কেড়ে নেওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে আমার প্রিয় দার্শনিক অ্যারিস্টটলের কথা মনে পড়ে। তিনি ‘প্লেজার’ ও ‘হ্যাপিনেস’ – এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। সাময়িক আরাম বা ভোগই সুখ নয়; বরং ত্যাগের মধ্য দিয়েই প্রকৃত সুখ অর্জিত হয়।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “একটি শিশু নিজের খাবার ক্ষুধার্ত একজন মানুষের হাতে তুলে দিলে সে সাময়িক কষ্ট পায়, কিন্তু সেই ত্যাগ তাকে গভীর সুখ দেয়। অর্থাৎ ত্যাগের মাধ্যমে যে আনন্দ অর্জিত হয়, সেটিই প্রকৃত সুখ। তাসাউফও মানুষকে সেই আত্মিক সুখের সন্ধান দেয়, যেখানে বস্তুজগতের দুঃখ-কষ্ট আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না।”

সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যামফোর্ডের রহমানতুল্লিল আলামিন জামে মসজিদের খতিব এবং নর্থ আমেরিকান মুসলিম এলায়েন্সের প্রেসিডেন্ট শায়খ মুহাম্মদ সাইফুল আজম বাবর আজহারী।

তিনি বলেন, “আমরা যে বিষয়ই অধ্যয়ন করি—বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃত, দর্শন, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান—সবই জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। আরবি পরিভাষায় ‘ইলম’ বলতে জ্ঞানকে এবং ‘হিকমাহ’ বলতে প্রজ্ঞাকে বোঝানো হয়। অনেকেই মনে করেন, ইলম বলতে শুধু কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানই বোঝায়। অথচ আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য জ্ঞানের বিস্তৃত জগৎ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো মৌলিক দ্বন্দ্ব নেই। দুটির কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। বিজ্ঞান দৃশ্যমান ও প্রাকৃতিক জগতের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করে, আর ধর্ম মানুষের অস্তিত্ব, সৃষ্টির উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, মৃত্যু-পরবর্তী জীবন এবং স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের মতো অধিবিদ্যাগত প্রশ্নের উত্তর দেয়। তাই একটির সঙ্গে আরেকটির সংঘর্ষ হওয়ার সুযোগ নেই।”

বাবর আজহারী বলেন, “মানুষের মনে অসংখ্য প্রশ্ন জন্ম নেয়—আমি কে, আমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, মৃত্যুর পর কী হবে, ভালো-মন্দের মানদণ্ড কী, পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্ট কেন রয়েছে। এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর শুধু পরীক্ষাগারে বা বিজ্ঞানের মাধ্যমে পাওয়া যায় না। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপনাকে নানা দর্শন ও তত্ত্ব শেখাবে, কিন্তু অন্তরের প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না।”

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, “আধুনিক বিশ্ব বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চায় অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে কোনো সভ্যতার অর্জন একদিনে তৈরি হয় না। কেউ ভিত্তি নির্মাণ করে, কেউ গবেষণার মাধ্যমে তা সম্প্রসারণ করে, কেউ ব্যাখ্যা ও পরিমার্জন করে। তাই জ্ঞানের ইতিহাসকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। আজকের পৃথিবীতে বস্তুগত উন্নতি যত বেড়েছে, মানুষের অন্তরের প্রশান্তি বা ‘সুকুন’ ততই কমে যাচ্ছে। শারীরিক ব্যথার ওষুধ পাওয়া যায়, কিন্তু আত্মার অশান্তির কোনো ওষুধ কেবল বস্তুগত উন্নতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রকৃত প্রশান্তি অর্জনের জন্য জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার বিকল্প নেই।”

সেমিনারে ইসলামী চিন্তাবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং আগ্রহী ব্যক্তিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

শিক্ষার্থী সংকটে মুড়িয়াহাট উচ্চ বিদ্যালয়

সান্তাহারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীর মৃত্যু

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে নিষিদ্ধ আ.লীগ নির্বাচনের সুযোগ পাবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ, এএসআইসহ দুজন কারাগারে

কুড়িগ্রামে বাকপ্রতিবন্ধী দম্পতির ঘরে একসঙ্গে ৩ পুত্রসন্তান, চিকিৎসায় হিমশিম

প্রাণী ও প্রকৃতির সুরক্ষায় শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

র‍্যাব বিলুপ্ত, সংসদে এসআরবি আইন অনুমোদন

গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা করের রিট খারিজ হাইকোর্টে

একটি সহানুভূতির কথাই বাঁচাতে পারে জীবন: নোবিপ্রবিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের র‍্যালি

১০

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক নেই, একক প্রার্থী চায় বিএনপি

১১

বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে নেপালের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

১২

বগুড়াতে হিজড়া সম্প্রদায়কে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ ও জনভোগান্তি: বাস্তবতা, আইন ও করণীয়

১৩

নারীকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব কতটা বাস্তব?

১৪

কুবি আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতায় টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ

১৫

ডাকসুর উদ্যোগে কবি ফররুখ, আবরার ফাহাদসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

১৬

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে ঢাকায় বিপিএর মানববন্ধন ও সচেতনতামূলক পদযাত্রা

১৭

ঢাবিতে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা

১৮

ভূরুঙ্গামারীতে অধিক দামে সার বিক্রির চেষ্টা: মোবাইল কোর্টে জরিমানা, প্রশাসন ও নেতৃবৃন্দের সময়োপযোগী পদক্ষেপে স্বস্তি

১৯

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে ঢাবিতে ‘আলো জ্বালাই, জীবন বাঁচাই’ কর্মসূচি

২০