
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কোডিং পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্তের প্রায় দশ মাস পার হলেও এখনো তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ ও হতাশা। তাদের দাবি, কোডিং পদ্ধতি চালু হলে খাতা মূল্যায়নে পক্ষপাতিত্ব ও নম্বর বৈষম্যের অভিযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
জানা যায়, গত বছরের ১৪ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিল সভায় পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের পরিচয় গোপন রাখতে কোডিং পদ্ধতি চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর নাম বা রোল নম্বরের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কোড ব্যবহার করা হবে, যাতে পরীক্ষক পরীক্ষার্থীর পরিচয় জানতে না পারেন। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কার্যকর হয়নি এই ব্যবস্থা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সময় ব্যক্তিগত পরিচয়, বিভাগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিংবা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নম্বর প্রদানে প্রভাব ফেলে। তাদের মতে, কোডিং পদ্ধতি চালু হলে মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে।
সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ আলবী বলেন, “এখনো নাম ও রোলবিহীন কোডিং পদ্ধতি বাস্তবায়ন না হওয়াটা সত্যিই দুঃখজনক এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বেমানান। সনাতন পদ্ধতিতে নাম বা রোল নম্বর দৃশ্যমান থাকায় খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবচেতনভাবেই পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্যের ঝুঁকি থেকে যায়, যা শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একাডেমিক কাউন্সিলে সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও বাস্তবায়ন না হওয়া হতাশাজনক। আমরা চাই প্রশাসন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত কোডিং সিস্টেম চালু করুক।”
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী তালহা তামিম বলেন, “প্রশাসন নাম-রোলবিহীন কোডিং পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিলেও এখনো তা কার্যকর না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে উদ্যোগটির কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও শিক্ষাবান্ধব মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. হাসনাত কবীর বলেন, “টেকনিক্যাল কিছু সমস্যার কারণে এখনো কোডিং পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এ পদ্ধতি চালু করতে পারব। পরে ধাপে ধাপে সব ব্যাচে এটি কার্যকর করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এখানে আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতা নেই, মূলত সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত কিছু জটিলতার কারণেই বিলম্ব হচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল প্রক্রিয়া বর্তমানে অটোমেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কোডিং পদ্ধতি চালু হলে নতুন সিস্টেম অনুযায়ী নম্বর ইনপুট ও পরে তা রোলে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য সফটওয়্যারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সফটওয়্যার প্রোভাইডারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতেও কিছু পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। তাই বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগছে। তবে এ বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে।”
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই রাবি শিক্ষার্থীরা নাম ও রোলবিহীন খাতা মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। গত বছরের ২৯ জুন ‘রাবি সংস্কার আন্দোলন’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবনের সামনে ৯ দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেন। দাবিগুলোর অন্যতম ছিল রোলবিহীন খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরিচিত শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া এবং অপছন্দের শিক্ষার্থীদের কম নম্বর দেওয়ার প্রবণতা মূল্যায়নের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মন্তব্য করুন