
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিকেল সেন্টারের ওষুধের হিসাবের অনিয়ম, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকের পর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রধান মেডিকেল অফিসার (সিএমও) ড. শামসুর রহমান দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুর রব।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে মেডিকেল সেন্টারে শিক্ষার্থীদের অবরোধ কর্মসূচির পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রধান মেডিকেল অফিসার ড. শামসুর রহমানকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বিকেল ৩টার দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস পাওয়ার পর অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।
অবরোধ শেষে জাকসুর স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক হুসনে মুবারক বলেন, “প্রধান মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধে ওষুধের হিসাবসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পাশাপাশি প্রশাসনের দীর্ঘদিনের গাফিলতির কারণেই মেডিকেল সেন্টারের এমন দুরবস্থা তৈরি হয়েছে।”
তিনি বলেন, “মেডিকেল সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে আমরা পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছি। এর মধ্যে সাত দিনের মধ্যে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, ছয়জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ, মেডিকেল সেন্টারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আরও ১০টি কক্ষ নির্মাণ, অপারেশন থিয়েটারের আধুনিকায়ন, নতুন দুটি অ্যাম্বুলেন্স চালু এবং মেডিকেল সেন্টারের পরিচালক হিসেবে একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে। প্রশাসন এসব বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে আমরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করব।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ৩০ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে ১৯ হাজার ৫৬৭টি ওষুধের হিসাব পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ওষুধগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য ৭৩ হাজার ১১০ টাকা। এছাড়া প্রধান মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়। এসব বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় তাঁকে অবরুদ্ধ করা হয় বলে দাবি করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও তদন্ত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবদুর রব বলেন, “মেডিকেল সেন্টারের ওষুধের হিসাবের অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর স্টোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর প্রধান মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদ্যমান শূন্য পদে নিয়োগ এবং নতুন পদের অনুমোদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রস্তাব পাঠানো হবে।
এদিকে একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি অফিস আদেশে মেডিকেল সেন্টারের ওষুধের মজুদে গরমিলের অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুর রবকে সভাপতি করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সালেকুল ইসলাম এবং দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুছ ছাত্তার। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রেজিস্ট্রার অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (কাউন্সিল শাখা) আলাউদ্দিন মোল্লা।
তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে এবং চিকিৎসা কেন্দ্রের উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (স্টোর) মো. নুর-এ-কামালকে ২৩ জুলাই পূর্বাহ্ন থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী জীবিকা নির্বাহ (সাবসিস্টেন্স) ভাতা হিসেবে সর্বশেষ মূল বেতনের অর্ধেক এবং প্রযোজ্য অন্যান্য ভাতা পাবেন বলে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন