
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিলেন। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় বন্ধের দিনগুলোতে তিনি সাঙ্গু নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে আয় করেছেন। তার এই আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলেই এবার বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
থানচি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে তিন্দু ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৫৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও ছয়জন শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে আসছেন।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থসংকটে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধ সম্ভব না হওয়ায় একসময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিলেন জেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা পরিচালনা করে অতিরিক্ত আয় শুরু করেন। সেই আয়ের বড় অংশ শিক্ষকদের বেতন, বিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা হয়।
প্রধান শিক্ষকের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি সরকারের নজরে আসে। পরে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের জীর্ণ টিনশেড ভবনের চারটি কক্ষের মধ্যে তিনটিতে পাঠদান চলছে এবং একটি কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনের পেছনের একটি কক্ষ ছাত্রাবাসের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নবম শ্রেণিতে ৪ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৮ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৯ জন এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮ জন ছিল।
শিক্ষার্থী থংয়াং খুমী, রুমি খেয়াং ও থুইমেচিং মারমা জানায়, দুর্গম এলাকা এবং পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে তারা আরও উন্নত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।
সহকারী শিক্ষক পুচিংমং মারমা বলেন, শিক্ষকদের বেতন নিশ্চিত করতেই প্রধান শিক্ষককে নৌকা চালাতে হয়েছে। তবে দীর্ঘ ছয়-সাত বছর ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করা অনেক শিক্ষক জাতীয়করণের শর্তের কারণে বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিলেন বলেন, “আমি এই দুর্গম এলাকার সন্তান। একসময় এখানে এসএসসি পাস শিক্ষার্থীও পাওয়া কঠিন ছিল। তাই বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। নৌকা চালিয়ে যে আয় হয়েছে, তা শিক্ষকদের বেতন ও বিদ্যালয়ের ব্যয়ে ব্যবহার করেছি। বিদ্যালয়টি পুরোপুরি সরকারি হলে এই অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা স্বল্প খরচে শিক্ষার সুযোগ পাবে।”
তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, দুর্গম এ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষার সুযোগ পাবে।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ফয়সাল বলেন, সরকারের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিন্দু ও রেমাক্রি এলাকার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।
মন্তব্য করুন