
সরকারি চাকরির স্বপ্ন পূরণে অবলম্বন করেছিলেন প্রতারণার পথ। নিজেরা পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে চাকরি নিশ্চিত করেছিলেন দুই যুবক। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছিল। নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত নিয়োগপত্রও হাতে পান তারা। তবে চাকরিতে যোগদান করতে এসে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যায় পুরো জালিয়াতির ঘটনা। পরে তাদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
রোববার (২১ জুন) রাত সোয়া ৯টার দিকে নোয়াখালীর মাইজদী বাজারে অবস্থিত কর অঞ্চল নোয়াখালীর কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
আটকরা হলেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত কামাল উদ্দিন এবং অফিস সহায়ক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত নাসফুর উল্যাহ হুমায়ুন। তাদের বাড়ি যথাক্রমে সদর উপজেলার ব্রহ্মপুর ও হাতিয়া উপজেলার গুল্যাখালী এলাকায়। জানা গেছে, নাসফুর উল্যাহ হুমায়ুনের এক মামা আয়কর বিভাগে কর্মরত রয়েছেন।
কর অঞ্চল নোয়াখালীর উপ কর কমিশনার এনামুল হাসান আল নোমান জানান, গত ১১ জুন অনুষ্ঠিত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত বিভিন্ন পদে মোট ১১২ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচিতদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও মেডিক্যাল রিপোর্টসহ রোববার যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
নির্ধারিত সময়ে যোগদান করতে এলে কামাল উদ্দিন ও নাসফুর উল্যাহ হুমায়ুনের আচরণ, পরিচয় এবং নথিপত্র দেখে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। পরে তাদের হাতের লেখা পরীক্ষা সংক্রান্ত নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা স্বীকার করেন, নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত ও মৌখিক উভয় ধাপেই তাদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুই ব্যক্তি জানান, সরকারি চাকরি নিশ্চিত করার আশায় তারা একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের সঙ্গে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন। ওই চক্র টাকার বিনিময়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করে এবং পুরো পরীক্ষার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
তাদের দাবি, আবেদন করার সময়ই প্রবেশপত্রে ব্যবহৃত ছবি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য কেউ পরীক্ষায় অংশ নিলেও বিষয়টি সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ওই প্রক্সি পরীক্ষার্থীরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তাদের উত্তীর্ণ করায়।
চাকরির সব ধাপ সফলভাবে পার হওয়ার পর যোগদানের দিনই বিপাকে পড়েন দুই যুবক। কর্মকর্তাদের সতর্কতা ও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের মুখে তাদের প্রতারণা ধরা পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কর বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ঘটনার পেছনে একটি সুসংগঠিত জালিয়াত চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা চাকরিপ্রার্থীদের সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। আটকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সুধারাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইদ্রিসুর রহমান বলেন, কর অঞ্চল কার্যালয় থেকে দুই ব্যক্তিকে থানায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তি বা চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও তদন্ত করা হবে।
এই ঘটনা সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই-বাছাই, বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।
তবে শেষ মুহূর্তে কর্তৃপক্ষের সতর্কতায় জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটিত হওয়ায় সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।
মন্তব্য করুন