এলিন মাহবুব, কলামিস্ট
১৪ মে ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় মিথ্যা কী?

Share this news with

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সবচেয়ে বড় মিথ্যা সম্ভবত এই কথাটিই “ভালো রেজাল্ট করলেই জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত।” এই একটি বাক্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাজারো তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন, ভয়, সিদ্ধান্ত এবং আত্মপরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ছোটবেলা থেকে তাদের শেখানো হয়, ভালোভাবে পড়াশোনা করো, ভালো রেজাল্ট করো, একটা ‘নিরাপদ’ চাকরি পেয়ে যাবে, তারপর জীবন ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এত সরল?

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন কারা? আশ্চর্যজনকভাবে, তারা সমাজের সবচেয়ে অলস বা অশিক্ষিত মানুষ নয়। বরং সবচেয়ে উদ্বিগ্ন সেই মধ্যবিত্ত তরুণ, যে বছরের পর বছর পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর তুলেছে, পরিবারকে খুশি করেছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের অনিশ্চয়তার সামনে এসে হঠাৎ বুঝতে পারছে—ডিগ্রি আছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা নেই।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের একটি নির্দিষ্ট ছকে বড় করে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার বা ব্যাংকার এই কয়েকটি পেশাকে “সফলতা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে শিশুরা খুব ছোটবেলা থেকেই নিজেদের প্রকৃত দক্ষতা বা আগ্রহ নয়, বরং “সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিরাপত্তা”র পেছনে দৌড়াতে শেখে। তারা শেখে কীভাবে পরীক্ষায় নম্বর তুলতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে ব্যর্থতা সামলাতে হয়, কীভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয়, কিংবা কীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হয়।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই মিথ্যা তাদের স্বপ্ন দেখতে ভয় পাইয়ে দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হতে চেয়েও পিছিয়ে যায়, কারণ ব্যর্থ হলে পরিবার ও সমাজের সামনে “মুখ দেখানো যাবে না।” কেউ কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চায়, কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করতে চায়, কেউ নতুন কোনো স্কিল শিখতে চায়—কিন্তু প্রায়ই তাদের বলা হয়, “এসব করে ভবিষ্যৎ হবে না।”

অথচ পৃথিবী বদলে গেছে। বর্তমান বিশ্বে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠছে অভিযোজন ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এমন এক যুগ নিয়ে আসছে, যেখানে শুধু মুখস্থবিদ্যা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে। যেসব কাজ নিয়ম মেনে বারবার করা যায়, সেগুলোর অনেকগুলোই মেশিন করে ফেলবে। তখন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে নতুন চিন্তা করার ক্ষমতা।

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক মানসিকতা এখনো অনেকাংশে পুরোনো নিরাপত্তাবোধে আটকে আছে। ফলে হাজারো তরুণ আজ দ্বিধার মধ্যে বেঁচে আছে। একদিকে পরিবারকে হতাশ না করার চাপ, অন্যদিকে নিজের ভেতরের অস্থিরতা। তারা বুঝতে পারছে পৃথিবী বদলেছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য তাদের প্রস্তুত করা হয়নি।

এই কারণেই আজ বাংলাদেশের অনেক শিক্ষিত তরুণের মুখে ক্লান্তি। তারা পরিশ্রম করতে চায় না, বিষয়টি এমন নয়। বরং তারা বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও নিশ্চিত ভবিষ্যতের কোনো দরজা খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ তাদের শেখানো হয়েছিল শুধু “ভালো ছাত্র” হতে, কিন্তু শেখানো হয়নি কীভাবে অনিশ্চিত পৃথিবীতে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়।

তবে এই বাস্তবতা হতাশার নয়; বরং জাগরণের। মধ্যবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তিও এখানেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা স্বপ্ন দেখতে জানে। বাংলাদেশের অসংখ্য উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, লেখক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ছোট ব্যবসায়ী ঠিক এই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই উঠে এসেছেন। তারা হয়তো খুব নিরাপদ পথ বেছে নেননি, কিন্তু তারা শিখেছেন পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে।

আজ প্রয়োজন নতুন এক সংলাপের। সন্তানকে শুধু “ভালো রেজাল্ট করো” বলার সময় শেষ। এখন তাকে বলতে হবে নতুন কিছু শেখো, মানুষের সমস্যা বোঝো, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াও, প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে ব্যবহার করতে শেখো। কারণ ভবিষ্যৎ শুধু তাদের নয় যারা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে; ভবিষ্যৎ তাদের, যারা পরিবর্তনের আগেই নিজেকে বদলাতে শিখেছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সবচেয়ে বড় মিথ্যা ছিল নিরাপদ পথ সফলতার একমাত্র পথ। অথচ বাস্তবতা হলো, এই যুগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে পরিবর্তনকে অস্বীকার করা।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিয়ে বাড্ডায় জামায়াতের মোমবাতি মিছিল

হাসনাপাড়া স্পার এলাকা পরিদর্শনে এমপি কাজী রফিকুল ইসলাম

বরিশালে জামায়াতের রুকন সম্মেলন অনুষ্ঠিত, সরকারের বিরুদ্ধে মুজিবুর রহমানের অভিযোগ

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট: সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের দাবি ডা. শফিকুর রহমানের

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা সিস্টেমে আনতে জনসচেতনতা প্রয়োজন: বগুড়া সিটি প্রশাসক

খুলনায় জামায়াতের যুব সম্মেলন: রাষ্ট্র সংস্কারে তরুণদের ভূমিকা রাখার আহ্বান

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকদের দুর্দশা, মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনসহ ৬ দাবি

সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৩ শ্রমিকের মৃত্যু

বিদ্যুতের আলো থেকে দূরে বান্দরবানে শত শত পাহাড়ি গ্রাম

জাতীয় শিক্ষক ফোরাম ঢাকা বিভাগের প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত

১০

১৫ আগস্ট সামনে রেখে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি, ৫৩ জন আটক

১১

রাষ্ট্রপতি পদে কর্নেল অলি আহমদের মনোনয়ন জমা, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন চায় ১১ দল

১২

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ইসিতে জমা পড়েছে তিন মনোনয়নপত্র

১৩

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল, মনোনয়ন জমা দিয়ে দলীয় পদ ছাড়লেন

১৪

জাকসুর উদ্যোগে ১৩টি হল মসজিদ ও কেন্দ্রীয় মন্দিরে পাঠাগার চালু

১৫

ছাত্রলীগ সন্দেহে জাবির সাবেক শিক্ষার্থীকে মারধর, পুলিশ হেফাজতে ঢামেকে শারীরিক পরীক্ষা

১৬

ধুনটে বিধবার জমির পথে বাঁশের বেড়া, প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

১৭

ধুনটের চার মামলার আসামি, টাঙ্গাইলে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার

১৮

চিকিৎসার সব চেষ্টা ব্যর্থ, একই কবরে চিরনিদ্রায় শরীর জোড়া লাগা যমজ জয়নব-উম্মে কুলসুম

১৯

মন্ত্রিসভায় রদবদল: স্বরাষ্ট্রের দায়িত্বে এ্যানি, এলজিআরডিতে সালাহউদ্দিন

২০