
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক কর্তৃক খাবারে মাছি পাওয়া এবং হোটেল কর্মচারিকে হালিম ছুঁড়ে মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনায় ক্যাম্পাসের বটতলা এলাকার দোকানগুলো চাপ প্রয়োগ করে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বটতলার তিনটি হলের (মওলানা ভাসানী, শের-ই-বাংলা এবং আ.ফ.ম কামালউদ্দীন) অধীনে থাকা দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে জাকসু প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বটতলায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা জাকসুর নেতার অসদাচরণের বিপক্ষে ছিলেন, তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। অন্যদিকে, জাকসুতে ছাত্রশক্তি থেকে নির্বাচিত কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতিসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী অপর পক্ষের হয়ে সেখানে উপস্থিত থাকেন। দুই গ্রুপের পাল্টা দাবিতে সেখানে তুমুল বাক-বিতণ্ডা তৈরি হয়।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার রাতে। বটতলার হাবিবের দোকানে (বামের দোকান নামে পরিচিত) খাবার খেতে যান জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য সম্পাদক হুসনে মোবারক ও কার্যকরি সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতী। তারা হালিম খেতে বসলে হালিমে মাছি থাকায় ক্ষিপ্ত হয়ে হুসনে মোবারক এক কর্মচারীর গায়ে হালিমের বাটি ছুঁড়ে মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর জেরে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে ভুক্তভোগী কর্মচারীর পক্ষে এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে কিছু শিক্ষার্থী দোকানগুলো বন্ধ করে দেন বলে জানা যায়।
তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, দোকানিরা তাদের সহকর্মীকে হেনস্থার প্রতিবাধে দোকান বন্ধ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তারা কেবল যৌক্তিক দাবির পক্ষে দোকানিদের সাথে একাত্ততা পোষণ করেছেন। তবে জানা যায়, দোকানিরা সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট কিংবা হল সংসদের কাছে কোন লিখিত অভিযোগ দেননি।
এ ঘটনায় জাকসুর কার্যকারী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতি সেখানে উপস্থিত হয়ে দাবি করেন “দোকানগুলো দোকানিরা বন্ধ করেনি বরং একটি গোষ্ঠী বন্ধ করিয়েছে”। তখন দুই পক্ষের মধ্যে চরম বাক-বিতণ্ডা তৈরি হয়।
এসময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে চিশতিকে বহিষ্কারের দাবি উঠে এবং তাকে গুপ্ত সম্বোধন করে স্লোগান তোলেন তারা। তবে শিক্ষার্থীদের সম্মুখ সারির অনেকেই ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচিত।
এ বিষয়ে বটতলার দোকান মালিকদের সাথে কথা বলতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকান মালিক জানান, “আমি সাভারে ছিলাম। আমাকে দোকান থেকে ফোন করে বলা হয় কিছু শিক্ষার্থী দোকানে এসে দোকান বন্ধ করতে বলতেছে। ইতোমধ্যে বটতলার অন্যান্য অনেক দোকান তারা বন্ধ করে দিয়েছে। আমি তখন আমার দোকানের কর্মচারীকেও দোকান বন্ধ করতে বলি।”
আ ফ ম কামালউদ্দীন হলের অধীনস্থ অন্য এক দোকানদার বলেন, “কামাল উদ্দিন হলের সিকবয় কবির এসে বলেন বটতলায় একটা ঝামেলা হইছে, রাত ৭টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত দোকান বন্ধ রাখেন। ফয়সালার পর দোকান খুলবেন। তখন আমি জিজ্ঞেস করি, কে দোকান বন্ধ করতে বলেছে। তখন কবির জানান, কামাল উদ্দিন হলের ভিপি রায়হান কবির ভাই আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাদের দোকান বন্ধ করতে বলতে।”
তবে কামালউদ্দীন হলের ভিপি জি এম রায়হান কবির এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “দোকান বন্ধের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।”
মধ্য বটতলার আরেকজন দোকানদার জানান, “কয়েকজন ছাত্র এসে দোকান বন্ধ করতে বলেন। পরে আমরা দোকান বন্ধ করি।” কোন কারণ জানেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “কোন কারণ জানেন না। ছাত্ররা এসে দোকান বন্ধ করতে বলছে। তাই আমরা দোকান বন্ধ করছি।”
অন্যদিকে, মওলানা ভাসানী হলের ভিপি জানান, বিচারের দাবিতে দোকান মালিকরাই দোকান বন্ধ রেখেছেন বলে তিনি শুনেছেন; তবে জোরপূর্বক বন্ধের বিষয়ে তিনি অবগত নন।
দোকান কর্মচারিকে হালিম ছুঁড়ে মারার ঘটনায় অভিযুক্ত জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা সম্পাদক হুসনে মোবারক বলেন, “গতকাল রাতে দোকানে প্রবেশের সময়ই দেখি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে। কর্মচারীরা বড় নখ ও অপরিষ্কার হাতে সালাদ মাখাচ্ছিলেন, যা দেখে তাদের সতর্ক করি। পরবর্তীতে খাবার অর্ডার করে হালিম খাওয়ার সময় লক্ষ্য করি এতে একটি বড় আকারের নীল রঙের মাছি রয়েছে, যা দেখে আমি রাগান্বিত হয়ে যাই। এরপর একজন কর্মচারীকে ডেকে বিষয়টি দেখাই এবং শিক্ষার্থীদের এমন নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করার বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করি। পরে হালিমের বাটি বাইরে ফেলে দেই। এ সময় সামনে থাকা একটি কড়াইয়ের সাথে হালিমের বাটিটি লাগার কারণে বাটি ছিটকে কিছু হালিম রান্নার স্থানে পরে এবং সামান্য অংশ একজন কর্মচারীর শরীরে পড়ে।
দোকন বন্ধ করা এবং জাকসু প্রতিনিধি কর্তৃক কার্মচারিকে হালিম ছুঁড়ে মারার দুটি ঘটনা-ই তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. মেহেদী হাসান বলেন, “প্রশাসন বা সংসদকে না জানিয়ে দোকান বন্ধের এই ধৃষ্টতা প্রতিহত করা হবে। দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার শুধু সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।” তিনি জাকসু নেতার আচরণের নিন্দা জানিয়ে খাবারের মান নিশ্চিতে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
বুধবার রাতের উত্তেজনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এড়াতে উভয় পক্ষকে শান্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল (আজ) তিনটায় সিনেট হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, প্রক্টর এবং উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন