
লালমনিরহাটে সমবায় সমিতির আড়ালে চড়া সুদে ঋণ ও কিস্তি ব্যবসার অভিযোগে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ছয় মাসে “রাসা” ও “ব্যতিক্রম” নামের দুই সমিতি সাধারণ মানুষের প্রায় ১২ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, লোভনীয় মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এসব সমিতি সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা সংগ্রহ করে পরে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে।
জানা গেছে, শহরের ভোকেশনাল মোড়ে গড়ে ওঠা “ব্যতিক্রম সমবায় সমিতি” চড়া সুদে কিস্তিতে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ এবং আকর্ষণীয় অফারের মাধ্যমে শত শত গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। পরে সমিতির কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে যান। এ ঘটনায় কয়েকজন কর্মকর্তা আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকলেও অনেকেই এখনও পলাতক।
অন্যদিকে সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকায় গড়ে ওঠা “রাসা সমবায় সমিতি” একই কৌশলে সহস্রাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব সমিতি শতকরা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ দিতো। অনেক ক্ষেত্রে সদস্যদের কাছ থেকে খালি চেকে স্বাক্ষর নিয়ে ঋণ দেওয়া হতো। আবার কিস্তি পরিশোধে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেই গ্রাহকদের জমা অর্থ কেটে নেওয়া বা ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সমবায়ের লাইসেন্স নিয়ে অসংখ্য নামে-বেনামে সমিতি গড়ে উঠেছে। অনেকেই সমবায়ের মূল নীতিমালা না মেনে নিয়মবহির্ভূতভাবে সুদ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা। লাভের আশায় টাকা জমা রেখে শেষ পর্যন্ত পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন তারা।
সরেজমিনে আদিতমারী উপজেলার দুরারকুটি কলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এম এ হাসেম ওরফে বাবুল নামে এক ব্যক্তি “তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড” নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি লোভনীয় মুনাফার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করছেন এবং গ্রাহকদের চড়া সুদে ঋণ দিচ্ছেন। এছাড়া সদস্যদের জমাকৃত অর্থ ফেরত দিতে টালবাহানা এবং উচ্চমূল্যে নিম্নমানের পণ্য কিস্তিতে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
দুরারকুটি এলাকার অটোচালক মো. ফারুক অভিযোগ করে বলেন, “আমি ৯৯ হাজার টাকা জমা রেখেছি। সাত বছর পার হলেও পুরো টাকা পাইনি। মুনাফাও দেয় না। টাকা চাইতে গেলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হয়।”
তবে অভিযুক্ত হাসেম ওরফে বাবুল দাবি করেছেন, তিনি সমবায় আইন মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও তার সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সমবায়ের আড়ালে সুদ ব্যবসা ও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, “সমবায় সমিতির আড়ালে কেউ অনিয়ম বা সুদ ব্যবসা করলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে জেলা সমবায় অফিসের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সমিতির নিবন্ধন বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন