
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন কাঠামোয় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো, সদস্যদের প্রশিক্ষণ জোরদার এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নতুন আইনটি করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংশোধিত আকারে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ। দীর্ঘ আলোচনা ও বিরোধী দলের আপত্তির পর কণ্ঠভোটে বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিরোধীদের আপত্তি
বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সংসদে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধী দলের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, র্যাবের নাম পরিবর্তন করে একই ধরনের কাঠামো নতুন বাহিনীর মধ্যে বহাল রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিলটি অনুমোদন না করে প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, জনগণের প্রত্যাশা ছিল র্যাবের মতো বিতর্কিত বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ অবসান; একই ধরনের নতুন কাঠামো তৈরি করা নয়।
বিরোধী দলের সদস্যরা আরও বলেন, বিলটি দ্রুততার সঙ্গে সংসদে আনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। অপরাধ প্রতিকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন।
আলোচনায় অতীতে র্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও কথিত ক্রসফায়ারের অভিযোগের প্রসঙ্গও আসে। বিরোধী সদস্যদের আশঙ্কা, র্যাবের জনবল, সম্পদ ও অন্যান্য সক্ষমতা নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হলে অতীতের বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়তে পারে।
সরকারের ব্যাখ্যা
বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই র্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, নতুন এসআরবি হবে স্বতন্ত্র একটি ব্যাটালিয়ন এবং এর সঙ্গে র্যাবের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকবে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থে তৈরি করা অস্ত্র, যানবাহন, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও আধুনিক গোয়েন্দা সরঞ্জাম নষ্ট না করে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে নতুন বাহিনীর কাজে ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এসব সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হবে।
নতুন আইনে বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অনিয়ম বা অপকর্মের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ রাখার বিধান রয়েছে বলেও সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এপিবিএন আইনেও পরিবর্তন
একই অধিবেশনে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ আইন প্রণয়নের জন্য উত্থাপিত পৃথক বিলও পাস হয়েছে।
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর এপিবিএন-সংক্রান্ত বিলটি প্রথম উত্থাপন করা হয়েছিল। পরে সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটির কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়।
র্যাব থেকে এসআরবি
২০০৩ সালে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময় সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে বাহিনীটির ভূমিকা আলোচিত হলেও পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাব।
নতুন এসআরবি আইন পাসের ফলে র্যাবের আইনি অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে পৃথক আইনের অধীনে নতুন বাহিনী গঠনের পথ তৈরি হলো। এখন নতুন বাহিনী কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই হবে পরবর্তী পর্যায়ের মূল বিষয়।
মন্তব্য করুন