
নওগাঁ জেলাকে মাদক, জুয়া, চোরাচালান ও সর্বপ্রকার অপরাধমুক্ত করতে জেলা পুলিশের একের পর এক “বিস্ফোরক” সাঁড়াশি অভিযান চলছে। নবাগত পুলিশ এসপি জনাব মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতির কারণে মে মাসের ১ তারিখ থেকেই জেলার ১১টি থানাতেই একযোগে চলছে চিরুনি অভিযান।
চলতি মে মাসে নওগাঁ জেলা পুলিশ ও ডিবির আলোচিত এবং সফল অভিযানগুলোর উপজেলাভিত্তিক সর্বশেষ সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রানীনগর ও নিয়ামতপুরে পুলিশের কঠোর হানা:
সদর ও বড় উপজেলাগুলোর পাশাপাশি মে মাস জুড়ে “রানীনগর” এবং “নিয়ামতপুর” উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
রানীনগরে মাদক ও ওয়ারেন্ট তামিল: রানীনগর থানা পুলিশ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও রেললাইন সংলগ্ন মাদক স্পটগুলোতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। একই সাথে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা জিআর ও সিআর মামলার বেশ কয়েকজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
নিয়ামতপুরে চোলাই মদ ও মাদক সিন্ডিকেট ধূলিসাৎ: নিয়ামতপুর থানা পুলিশের চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চরাঞ্চল ও সীমান্তঘেঁষা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ চোলাই মদ ও গাঁজাসহ মাদক চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
২. মহাদেবপুর ও মান্দায় বিশেষ অভিযান:
মহাদেবপুর: উপজেলার বিভিন্ন স্পট ও জুয়ার আস্তানায় রাতভর অভিযান চালিয়ে চিহ্নিত মাদক সেবনকারী, বিক্রেতা এবং জুয়াড়িদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মান্দা: চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় অভিযান চালিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ছোট ছোট পুড়িয়া হেরোইন ও গাঁজাসহ মাদক কারবারিদের আটক করা হয়েছে।
৩. সদর ও ডিবির ত্রিমুখী অ্যাকশন এবং ভুয়া ডিবি গ্রেপ্তার:
১৬ মে-র ত্রিমুখী ধাক্কা: ডিবির পৃথক তিনটি আভিযানিক দল শহরের সুইপার কলোনি, আরজি নওগাঁ এবং চকদেব সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজ মোড়ে ব্যাক-টু-ব্যাক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, আধা কেজি গাঁজা এবং ৬০ পিস আমদানিকৃত নেশাজাতীয় বুপ্রেনরফিন এম্পলসহ (ইনজেকশন) ৪ জন হেভিওয়েট মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে।
ভুয়া ডিবি জামিল’ গ্রেপ্তার: ডিবির পরিচয় দিয়ে এক অসহায় নারীর কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া আন্তঃজেলা প্রতারক জামাল সরকার ওরফে ‘ডিবি জামিল’-কে শহরের অভিজাত হোটেল ‘মল্লিকা ইন’-এর সামনে থেকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
৪. বদলগাছী, পত্নীতলা ও ধামইরহাটে মাদকের চালান আটক:
বদলগাছী: থানা পুলিশ মাদক কারবারি সুরজিতের নিজ বাড়িতে হানা দিয়ে ৩০ লিটার চোরাই মদসহ তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে।
পত্নীতলা ও ধামইরহাট: সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় মাদক, ফেন্সিডিল ও চোরাচালান রোধে কঠোর নজরদারি ও টহল জোরদার করেছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।
৫. নওগাঁর ইতিহাসে মেধার জয়: ১২০ টাকায় পুলিশে চাকরি!
অপরাধ দমনের পাশাপাশি নওগাঁ জেলা পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে ১৭ মে রাতে। কোনো প্রকার তদবির, সুপারিশ বা ঘুষ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ উপায়ে মাত্র ১২০ টাকা সরকারি ফি দিয়ে নওগাঁর ৪৯ জন যোগ্য তরুণ-তারুণী বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
নওগাঁবাসীর দাবি: “লোক দেখানো নয়, এই রূপ যেন চিরকাল থাকে” পুলিশের এই একের পর এক সফল অভিযানকে নওগাঁর সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল একবাক্যে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে এর পাশাপাশি জেলাবাসীর মনে একটি জোরালো দাবিও উঁকি দিচ্ছে।
নওগাঁর সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন— “পুলিশের এই কঠোর ও প্রশংসনীয় অ্যাকশন যেন কেবল সাময়িক, মানুষ দেখানো কিংবা পত্রিকায় বড় বড় নিউজ করার জন্য না হয়। আমরা চাই পুলিশের এই অপরাধবিরোধী রূপ এবং সৎ মানসিকতা যেন বছরের সর্বক্ষণ, ৩৬৫ দিনই বজায় থাকে। কোনো তদবির বা চাপের মুখে যেন এই অভিযান ঝিমিয়ে না পড়ে।”
জনগণের এই প্রত্যাশার জবাবে নওগাঁ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে— রানীনগর, নিয়ামতপুর, মহাদেবপুর, মান্দা, সদরসহ জেলার প্রতিটি কোণ শতভাগ মাদকমুক্ত ও নিরাপদ না করা পর্যন্ত এই “বিস্ফোরক” অ্যাকশন এবং চিরুনি অভিযান আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র গতিতে এবং স্থায়ীভাবে অব্যাহত থাকবে। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, ছাড় পাবে না কেউ।
মন্তব্য করুন