ডেস্ক রিপোর্ট
২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১:২৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর: প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, বাড়ছে নতুন উদ্বেগ

Share this news with

জাতিগত নিধন ও সহিংসতার মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংকটের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ এই সময়ে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি এলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সহিংসতার পর কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে গড়ে ওঠে বিশাল শরণার্থীশিবির। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর বড় একটি অংশ শিশু, যাদের অনেকেরই জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে এবং মিয়ানমারের নিজস্ব ভূমি সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই।

নতুন করে অনুপ্রবেশ

রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের শরণার্থী সংকটের সঙ্গে নতুন অনুপ্রবেশ যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের ওপর মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ আরও বাড়িয়েছে।

প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৭ সালের পর পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা এবং একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের অনাস্থা ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তা কার্যকর হয়নি।

এরপর মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন এবং রাখাইনে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও পিছিয়ে দেয়। বর্তমানে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও যুদ্ধাবস্থার কারণে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।

এদিকে মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। সম্প্রতি দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের কথা জানানো হলেও তাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ বলছে, জাতিসংঘের নিবন্ধনেই রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সংকুচিত হচ্ছে সহায়তা

শরণার্থীশিবিরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রায়ও দেখা দিয়েছে নানা সংকট। আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা সংকুচিত হয়েছে। সীমিত আয়-রোজগার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা, মাদক চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো সমস্যাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অনেকে দালালের মাধ্যমে সাগরপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনাও ঘটছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শিশুদের ভবিষ্যৎ

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শিশু। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের অনেকেরই মিয়ানমারের নিজস্ব সংস্কৃতি, পরিবেশ ও বসতভিটা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেই। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বেড়ে ওঠার কারণে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিশুই নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে না। ফলে প্রত্যাবাসন আরও দীর্ঘায়িত হলে একটি প্রজন্ম শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়িত্ব শুধু শরণার্থীদের নয়, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস, সীমিত সম্পদ, কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন সমস্যা স্থানীয়দের মধ্যেও চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। সরকারের অবস্থান, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

আশার জায়গা কি আছে?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার মধ্যেও কূটনৈতিক পর্যায়ে নতুন কিছু সম্ভাবনার কথা সামনে আসছে। চীনসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কূটনৈতিক আলোচনা যথেষ্ট নয়; রাখাইনে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসন শুরুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নয় বছর পেরিয়েও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংকট আর কত দীর্ঘ হবে এবং কবে নাগাদ বাস্তব অর্থে নিজভূমিতে ফেরার সুযোগ পাবেন রোহিঙ্গারা।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়া গাবতলীতে ৩০৩ শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি দিলেন এমপি মোরশেদ মিল্টন

১

শেরপুরে অপহরণ মামলা ঘিরে শতকোটি টাকার মূর্তি নিয়ে রহস্য

২

মিরপুরে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

৩

বর্ণাঢ্য আয়োজনে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিলো গোবিপ্রবি প্রশাসন

৪

জুনিয়রকে গালিগালাজের জেরে গোবিপ্রবিতে প্রক্টরিয়াল বডির উপস্থিতে আইন-পরিসংখ্যান বিভাগের সংঘর্ষ

৫

আদমদীঘিতে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে প্রশাসনের প্রস্তুতি সভা

৬

আদমদীঘিতে প্রশাসন ফুটবল টুর্নামেন্টে নসরতপুরকে হারিয়ে সেমিফাইনালে সান্তাহার পৌরসভা

৭

ফেসবুকে অসহায় পরিবারের খবর পেয়ে পাশে দাঁড়ালেন শেরপুরের ইউএনও

৮

বগুড়ায় ঝড়ে গাছ উপড়ে মাদ্রাসার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচল অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী

৯

‎নোয়াখালীতে নবীন শিক্ষার্থীদের মাদক ও কিশোর গ্যাং থেকে দূরে থাকার আহ্বান: জনপ্রশাসন সচিব

১০

শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকবে ছাত্রদল: আজিজুলে সন্ধান

১১

বান্দরবানের নতুন জেলা প্রশাসক নাজনীন সুলতানা

১২

সাবেক এমপি রেজাউল হকের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

১৩

আলতাফনগরে গৃহবধূকে মারধরের ভিডিও ভাইরাল, তদন্তের দাবি

১৪

ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০ বিজিবির অভিযানে ২৪ কেজি ৪৫০ গ্রাম কষ্টি পাথরের মূর্তি আটক

১৫

কুড়িগ্রাম সিএনজি চালক ও মালিক সমিতির সড়ক অবরুদ্ধ: দাবি মেনে না নিলে কঠোর কমসূচি ঘোষণা

১৬

বগুড়ায় দুই শিশুকে ধর্ষণ মামলায় যুবকের ৬০ বছরের কারাদণ্ড

১৭

সেনবাগে নিখোঁজের একদিন পর ধানখেত থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার

১৮

ট্রাইব্যুনাল-১ এ জিয়াউল আহসানের গাড়িবহর প্রবেশ

১৯

শহরের সুবিধার অর্থনীতি আসলে কার কাঁধে দাঁড়িয়ে?

২০