
বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির কথা বলতে গেলে তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কিংবা তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনার কথা সামনে আসে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক গল্পের একটি বড় অংশ এখনো অদৃশ্য—নারীর শ্রম।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ফলে বিষয়টি শুধু নারীর কর্মসংস্থানের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতির অপূর্ণ ব্যবহার, পরিবারের আয় বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার সম্ভাব্য ক্ষতি।
একজন নারী যখন কাজের সুযোগ থেকে বাদ পড়েন, তখন ক্ষতিটা শুধু তার ব্যক্তিগত আয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি সম্ভাব্য আয়, সম্ভাব্য ব্যবসা, দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক অবদানও তখন জাতীয় অর্থনীতির বাইরে থেকে যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষিত ও কর্মক্ষম বয়সে থাকা সত্ত্বেও শ্রমবাজারের বাইরে থাকায় দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
শ্রমবাজারে নারীর পথে বাধা
নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কম থাকার পেছনে শিক্ষা, দক্ষতা ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সামাজিক ও পারিবারিক নানা বাধা।
ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের পরিচর্যার দায়িত্ব এখনো মূলত নারীর ওপরই বর্তায়। ফলে একজন নারী চাকরি বা ব্যবসায় যুক্ত হলেও তার পারিবারিক দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে কমে না। তাকে একই সঙ্গে উপার্জনকারী ও পরিবারের প্রধান পরিচর্যাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। এই ‘দ্বৈত বোঝা’ অনেক নারীকে কর্মজীবন থেকে সরে যেতে বাধ্য করে।
নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবও নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের পথে বড় বাধা। দীর্ঘ যাতায়াত, গণপরিবহনে হয়রানির আশঙ্কা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং শিশুর যত্নের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন না।
নারীর আয় বাড়লে বাড়ে পরিবারের সক্ষমতা
একজন নারী যখন আয় করতে শুরু করেন, তখন শুধু পরিবারের মোট আয়ই বাড়ে না; পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতাও শক্তিশালী হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সন্তানের ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ে।
নিজের আয় থাকায় নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। বিয়ে, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সম্পদ কেনা কিংবা ব্যবসায় বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার মতামতের গুরুত্ব বাড়তে পারে।
অর্থাৎ নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ কেবল পরিবারের আয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কর্মসংস্থান মানেই শুধু অফিসের চাকরি নয়
নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর অর্থ শুধু আরও বেশি নারীকে অফিসে চাকরি দেওয়া নয়। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, পেশাজীবী কাজ, শিল্প-কারখানা ও সেবা খাতসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
বিশেষ করে নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়েও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ এসব কাজ পরিবার ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বড় অংশ আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। নিরাপদ ও নারীবান্ধব পরিবহন, কর্মস্থলে শিশুযত্নের ব্যবস্থা, নমনীয় কর্মঘণ্টা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। একজন নারী কর্মজীবী হবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত অনেক সময় শুধু তার নিজের ওপর নির্ভর করে না; পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগানোর কথা বলছে। কিন্তু জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে অর্থনীতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করতে না পারলে সেই লভ্যাংশের বড় একটি অংশ অপূর্ণ থেকে যাবে।
নারীকে শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবে বুদ্ধিমান একটি বিনিয়োগ। একজন নারী যখন উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন, তখন তার ব্যক্তিগত আয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হয়।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—একজন নারী কেন কাজ করছেন না?
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—তিনি কাজ করতে চাইলে তার সামনে কী কী বাধা তৈরি করছি?
কারণ নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ যত কম থাকবে, বাংলাদেশের অর্থনীতিও ততটাই তার পূর্ণ সম্ভাবনার নিচে থাকবে। যে অর্থনীতি তার জনসংখ্যার অর্ধেক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না, সেই অর্থনীতি কখনোই তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে না।
মন্তব্য করুন