
তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে দানিউব নদীর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পড়েছে রোমানিয়া। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চেরনাভোদার চালু থাকা শেষ রিয়্যাক্টরটিও বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি রিয়্যাক্টর থেকে রোমানিয়ার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে। নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে একটি রিয়্যাক্টর জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে বন্ধ রয়েছে। একই কারণে দ্বিতীয় রিয়্যাক্টরটিও বন্ধ করতে হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ারইলেক্ট্রিকা জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ১৩ আগস্ট চালু থাকা রিয়্যাক্টরটি নিয়ন্ত্রিতভাবে বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নদীর পানির স্তর, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং কেন্দ্রটির পরিচালনাগত বিভিন্ন সূচকের ওপর।
রোমানিয়ার জল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১১ আগস্ট দেশটির প্রবেশমুখে দানিউবের পানিপ্রবাহ নেমে দাঁড়িয়েছে প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১ হাজার ৩৭০ ঘনমিটারে। এটি এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন প্রবাহের নতুন রেকর্ড। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রিয়্যাক্টর বন্ধের সম্ভাবনাকে প্রায় অনিবার্য বলে মন্তব্য করেছেন।
চেরনাভোদা কেন্দ্র সচল রাখতে এরই মধ্যে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নদীর তলদেশে থাকা পাথর ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরাতে বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি নদীর তলদেশ খনন, পানির গতিপথ পরিবর্তন এবং পানির প্রবাহ বাড়ানোর জন্য পাথরবোঝাই বার্জ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় রোমানিয়া আগস্টজুড়ে জ্বালানি জরুরি অবস্থা জারি করেছে। সরকার নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুতের চাহিদা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
এদিকে দানিউবের উজানে কিছুটা স্বস্তির খবর পাওয়া গেলেও তা রোমানিয়ার সংকট কাটাতে খুব একটা সহায়ক হবে না বলে মনে করছে দেশটির পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। হাঙ্গেরিতে নদীর পানির স্তর বাড়ায় পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি টারবাইন পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রোমানিয়ার অবস্থান দানিউবের একেবারে নিম্নপ্রবাহে হওয়ায় উজানের বৃষ্টিপাতের প্রভাব সেখানে পৌঁছাতে উল্লেখযোগ্য সময় লাগতে পারে।
চেরনাভোদার বর্তমান সংকট ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি নতুন ঝুঁকিও সামনে এনেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নিঃসরণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অনেক পারমাণবিক কেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়।
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলের কারণে নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এখন শুধু কৃষি বা পরিবেশ নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌপথে পণ্য পরিবহন এবং সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
মন্তব্য করুন