
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল-মামুনের বিরুদ্ধে এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং চাপ প্রয়োগ করে লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রভোস্ট দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে করা মন্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে শিক্ষার্থীকে ডেকে কথা বলা হয়েছিল।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। রোববার (১৬ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ইব্রাহীমের ভাষ্য অনুযায়ী, হলের প্রভোস্টের কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা, শিক্ষার্থীদের পছন্দের একটি খাবারের দোকান বন্ধ এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়। পোস্টের পর তাকে প্রভোস্টের কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয়।

ইব্রাহীমের দাবি, ঘটনার বিষয়ে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি মোবাইলে অডিও রেকর্ড চালু রেখেই প্রভোস্টের কক্ষে যান। সেখানে কথোপকথনের একপর্যায়ে তাকে ফোন বের করতে বলা হয়। তিনি এতে রাজি না হলে কয়েকজন হলকর্মী তার কাছ থেকে ফোন নিয়ে নেন বলে অভিযোগ করেন। কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাকে আটকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও দাবি তার।
শিক্ষার্থীর অভিযোগ, এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তাকে বিভিন্নভাবে চাপ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। তার আবাসিক সিট বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আবেদন করে ছাত্রত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় সাইবার অপরাধের মামলা করার কথাও বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইব্রাহীম আরও বলেন, একপর্যায়ে তাকে একটি লিখিত বক্তব্য নিজের হাতে লিখে দিতে এবং তাতে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয়। সেখানে তিনি হল সংসদের ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ কয়েকজনের প্ররোচনায় পড়ে ওই পোস্ট করেছেন—এমন বক্তব্য উল্লেখ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। পরে তার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলানো হয়। প্রভোস্টের কাছে ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের পোস্ট না করার প্রতিশ্রুতির পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
ঘটনার প্রমাণ হিসেবে প্রভোস্টের কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে পুরো বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য তাকে বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে শিক্ষার্থীর অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল-মামুন। তিনি বলেন, ইব্রাহীম তার বিষয়ে কিছু মন্তব্য করলেও আগে তার সঙ্গে কথা বলেননি। তাই বিষয়টি জানতে তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল।
প্রভোস্টের দাবি, হলের বিভিন্ন আয়োজন ও অর্থ বরাদ্দ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থী এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন, যেগুলো বাস্তব পরিস্থিতি না জেনেই করা হয়েছে। এ কারণে তিনি ইব্রাহীমকে ডেকে তার বক্তব্যের কারণ জানতে চান।
অধ্যাপক ইলিয়াস আল-মামুন বলেন, কথোপকথনের সময় তিনি জানতে পারেন, শিক্ষার্থী তাদের আলোচনা মোবাইলে রেকর্ড করছেন। অনুমতি ছাড়া কথোপকথন রেকর্ড করার বিষয়েও তিনি আপত্তি জানান। তার ভাষ্য, পরে শিক্ষার্থী নিজের ভুল স্বীকার করে এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পর তাকে চলে যেতে বলা হয়।
শিক্ষার্থীর মাকে ফোন দেওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন প্রভোস্ট। তার দাবি, ছেলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অভিভাবককে জানাতেই ওই ফোন করা হয়েছিল। শিক্ষার্থীর বাবাকে ফোনে পাওয়া না গেলেও তার মায়ের সঙ্গে কথা হয়। পরে শিক্ষার্থীকে বসিয়ে নাশতা দেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে প্রভোস্ট বলেন, শিক্ষার্থীকে মারধর বা নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তার দাবি, পুরো বিষয়টি ছিল শিক্ষার্থীর করা পোস্ট নিয়ে আলোচনা ও ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের চেষ্টা।
অধ্যাপক ইলিয়াস আল-মামুন আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত তথ্য জেনে নেওয়া উচিত। হলের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় তারা নিয়মিত পরিশ্রম করছেন উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই করে মন্তব্য করার আহ্বান জানান।
শিক্ষার্থীর অভিযোগ এবং প্রভোস্টের বক্তব্যে ঘটনার বিবরণে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টির প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন