
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালি ইউনিয়নের কাচনা হাজিপাড়া এলাকার বৃদ্ধ নিনদালু ইসলামের পরিবারে যেন একের পর এক নেমে এসেছে দুর্ভাগ্যের ছায়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর পর পুরোপুরি থমকে গেছে এই সংসারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বর্তমানে ভাঙা ঘর, রোগব্যাধি আর চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবন কাটছে পরিবারটির।
ঝুঁকিপূর্ণ ঘর আর ইউরিয়ার বস্তার স্যানিটেশন:
সরেজমিনে কাচনা হাজিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরে কোনোমতে বসবাস করছেন বৃদ্ধ নিনদালু ইসলাম, তার স্ত্রী এবং মেয়ে। সাম্প্রতিক কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। ভেঙে পড়া ঠেকাতে ঘরের চারপাশ বাঁশ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। বৃষ্টির সময় ছিদ্র হওয়া টিন দিয়ে পানি পড়ে পুরো ঘর ভিজে যায়।
শুধু থাকার ঘরই নয়, পরিবারটিতে নেই কোনো নিরাপদ স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও। ইউরিয়ার বস্তা দিয়ে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা একটি খোলা পায়খানাই বর্তমানে তাদের একমাত্র ভরসা।
ছেলের মৃত্যুতেই শুরু দুর্ভাগ্যের:
বৃদ্ধ নিনদালু ইসলাম জানান, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে সেকেন্দার ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন এবং তিনিই ছিলেন সংসারের একমাত্র চালিকাশক্তি। প্রায় পাঁচ বছর আগে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় চলন্ত বাসে ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা যান সেকেন্দার। সেই থেকেই মূলত ভেঙে পড়ে এই পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি।
নিনদালু ইসলাম অশ্রুসজল চোখে বলেন, ”আমার ছেলেটাই ছিল সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। ও মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের সংসার আর আগের মতো নেই। ছেলের বউও গার্মেন্টসে চাকরি করে। সে এখন ঢাকায় দুই ছেলেকে নিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসে, কিন্তু তার নিজের সংসার চালানোই কঠিন।”
মেয়ের জীবনেও বারবার ট্র্যাজেডি:
পরিবারের দুর্ভাগ্য যেন এখানেই শেষ নয়। নিনদালু ইসলামের মেয়ের প্রথম স্বামী বিয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায় মারা যান। পরে বড় ছেলে সেকেন্দার জীবিত থাকা অবস্থায় বোনকে দ্বিতীয়বার বিয়ে দেন। সেই সংসারে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু পাঁচ বছর সংসার করার পর দ্বিতীয় স্বামীও তাকে বাবার বাড়িতে রেখে চলে যান। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নিতে রাজি হননি।
বাবার ভাঙা ঘরে আশ্রয় নেওয়া নিনদালু ইসলামের মেয়ে ক্ষোভ ও দুঃখে বলেন, ”আমি আর বিয়ে করব না। বাবা-মাকে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।”
অসুস্থতা আর অনাহারই নিত্যসঙ্গী:
বৃদ্ধ নিনদালু ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না, একটু হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির সমস্যা বেড়ে যায়। অর্থের অভাবে চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুমুঠো অন্ন সংস্থান করাই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বৃদ্ধার মেয়ের অন্যের বাড়িতে কাজ করে আনা চাল-ডাল ও সামান্য আয়ে কোনোমতে দিনমজুরি চলে তাদের।
নিনদালু ইসলামের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ”আমার স্বামী অসুস্থ মানুষ, হাঁটতে পারে না। আমি নিজেও শরীরে শক্তি পাই না, কাজ করতে পারি না। ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে মানুষের কাছে হাত পেতে কোনোভাবে চলছি। মেয়েটা মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা আনে, তাই দিয়ে কোনোমতে একবেলা খাই, তো অন্যবেলা উপোস থাকি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “কিছুদিন আগের ঝড়ে ঘরের টিন ফেটে গেছে। রাতে ঘুমাতে ভয় লাগে, কখন মাথার ওপর ঘর ভেঙে পড়ে জানি না। বৃষ্টি হলেই বিছানাপত্র সব ভিজে যায়।”
সহায়তার আকুতি এলাকাবাসীর:
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলা আর কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা তাদের কপালে জোটেনি।
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি কোনো আবাসন প্রকল্প বা পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় এনে এবং সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে হয়তো এই অসহায় পরিবারটি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে। তারা অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও দেশের দানশীল ব্যক্তিদের প্রতি নিনদালু ইসলামের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন