
দেশের মসলার বাজারে এখন অসম লড়াই চলছে। একদিকে বৈধ পথে শুল্ক দিয়ে আসা পণ্য, অন্যদিকে চোরাই পথে আসা সস্তা মসলা। অবৈধ পথে আসা পণ্যের দাপটে খাতুনগঞ্জের মতো দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজারেও ধস নেমেছে। বৈধ ব্যবসায়ীরা যখন লোকসান গুনছেন, সরকার তখন হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
সাধারণত বাজারে পণ্যের সংকট থাকলে দাম বাড়ে, কিন্তু বর্তমান চিত্র ঠিক উল্টো। বৈধ পথে আমদানি কম হওয়া সত্ত্বেও বাজারে মসলার কোনো ঘাটতি নেই, বরং দাম কমছে। এর মূল কারণ হলো সীমান্ত দিয়ে আসা করবিহীন চোরাই পণ্য।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কারণ:
আমদানিকারকদের এলসি খোলা, ডলার প্রিমিয়াম এবং উচ্চ শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে তাদের খরচ পড়ছে অনেক বেশি।
চোরাই মালের কোনো ট্যাক্স বা ভ্যাট না থাকায় তা অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে আমদানিকারকরা হয় লোকসানে পণ্য ছাড়ছেন, নয়তো গুদামে মাল স্তূপ করে রাখছেন।
বিপুল পরিমাণ পণ্য শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসায় সরকার বড় অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান বাজার দর একনজরে (পাইকারি):
বাজারে অধিকাংশ মসলার দাম গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় নিম্নমুখী। বর্তমানে খাতুনগঞ্জের বাজার পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো:
এলাচ (LMG) — ৪,১০০ টাকা
এলাচ (SMG) — ৩,৮০০ টাকা
জিরা (ভারতীয়) — ৫১৫ টাকা
জিরা (আফগান) — ৬৭০ টাকা
লবঙ্গ — ১,৩০০ টাকা
গোলমরিচ — (১,০৩০ – ১,২৩০) টাকা (কালো ও সাদা ভেদে)।
বাদাম (কাঠ ও কাজু) — ১,৩০০ টাকা
কিসমিস — (৭৯০ – ৮০০) টাকা (মানভেদে) এবং
দারুচিনি — ৪৮০ টাকা
খাতুনগঞ্জের মেসার্স আইমন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, এলসি ও শুল্ক মিলিয়ে পণ্যের যে কস্টিং পড়ে, চোরাই মাল তার চেয়েও কমে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি অমর কান্তি দাশ আক্ষেপ করে বলেন, ব্যবসায়ীদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন চোরাচালানের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য আসার কারণে বাজারে দামের এই নিম্নমুখী প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
আমদানির পরিসংখ্যান (২০২৫-২৬ অর্থবছর):
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন মসলা আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে রসুন, আদা ও দারুচিনির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
উল্লেখযোগ্য অন্যান্য আমদানির মধ্যে রয়েছে:
জিরা: ২,৭৯৩ টন
লবঙ্গ: ১,২৫৭ টন
এলাচ: ১,০৯৮ টন এবং
জায়ফল: ৩৪৬ টন
মসলার বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বৈধ ব্যবসায়ীদের রক্ষায় সীমান্ত পথে চোরাচালান বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী এই বাণিজ্যিক খাতটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
মন্তব্য করুন