
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত দক্ষিণের সাগরকন্যা কুয়াকাটা। বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা এই পর্যটন নগরী প্রতি বছরই ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের ছুটিতে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে ওঠে। এবারও ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পর্যটকের পদচারণায় মুখর রয়েছে সমুদ্রসৈকত ও এর আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো।
ঈদের প্রথম দিন তুলনামূলক শান্ত থাকলেও দ্বিতীয় দিন থেকে পর্যটকের চাপ বাড়তে শুরু করে। সপ্তাহজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত পর্যটকদের ভিড়ে প্রাণ ফিরে পায় কুয়াকাটার পর্যটন শিল্প। সৈকতের জিরো পয়েন্ট, ঝাউবন, গঙ্গামতির চর, কাউয়ার চর (মিনি সুইজারল্যান্ড), লেম্বুর বন এবং আশপাশের বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে দেখা গেছে মানুষের অবাধ বিচরণ।

মঙ্গলবার ও বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, সমুদ্রের বিশাল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দে মেতে উঠেছেন হাজারো পর্যটক। কেউ সমুদ্রে গোসল করছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ ঘোড়ার পিঠে চড়ে সৈকত ঘুরছেন। বিকেলের দিকে সৈকতের মূল কেন্দ্র ছাতা-বেঞ্চ বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কিটকট’ এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
দিনের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামার পরও থেমে থাকেনি মানুষের উপস্থিতি। বরং অনেক পর্যটকের কাছে কুয়াকাটার রাতই হয়ে উঠেছে ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ।
ঈদের তৃতীয় দিন পর্যটকের চাপ বাড়ায় অনেক আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টে কক্ষ সংকট দেখা দেয়। ফলে কিছু পর্যটক বাধ্য হয়ে সৈকতের ছাতা-বেঞ্চেই রাত কাটান। কথা হয় এমন কয়েকজন পর্যটকের সাথে। তবে তাঁদের অনেকের কাছেই এটি দুর্ভোগ নয়; বরং এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা।
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক বলেন, “হোটেলে কক্ষ না পেয়ে প্রথমে হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু রাতভর সমুদ্রের পাশে বসে থাকার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। চাঁদের আলোয় ঢেউ দেখার যে অনুভূতি, তা কোনো হোটেল কক্ষে বসে পাওয়া সম্ভব নয়।”

রাজশাহী থেকে আসা আরেক পর্যটক জানান, “ঈদের পর মাত্র দুই দিনের ছুটি পেয়েছিলাম। তাই বন্ধুদের নিয়ে চলে এসেছি কুয়াকাটায়। সৈকতের বেঞ্চে বসে পুরো রাত কাটিয়েছি। সমুদ্রের শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস যেন সব ক্লান্তি দূর করে দিয়েছে।”
গভীর রাতে সৈকতের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও নান্দনিক। চাঁদের আলোয় ঝলমল করা ঢেউ, দূরের জেলেনৌকার আলো আর অবিরাম সমুদ্রগর্জন মিলে সৃষ্টি করে এক স্বপ্নময় আবহ। অনেক পর্যটকের মতে, কুয়াকাটার প্রকৃত সৌন্দর্য দিনের চেয়ে রাতেই বেশি অনুভব করা যায়।
নিরাপদ রাতের সমুদ্র ভ্রমণ
রাতভর সৈকতে অবস্থান করলেও নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ দেখা যায়নি পর্যটকদের মধ্যে। পর্যটন পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত টহল পর্যটকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে।
পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আসা কয়েকজন পর্যটক জানান, গভীর রাত পর্যন্ত সৈকতে অবস্থান করেও তাঁরা স্বস্তিবোধ করেছেন। তাঁদের মতে, নিরাপদ পরিবেশের কারণেই কুয়াকাটা ধীরে ধীরে রাতের পর্যটনের জন্যও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পর্যটক আছে, কিন্তু খরচে সংযম
যদিও সৈকতে পর্যটকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, তবু পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
তাঁদের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমেছে। ফলে দীর্ঘ ছুটি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক আসেননি।
একাধিক হোটেল মালিক ও ব্যবসায়ী জানান, পর্যটক উপস্থিতি থাকলেও আগের মতো ব্যয় করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই স্বল্প সময় অবস্থান করছেন, কম খরচের আবাসন বেছে নিচ্ছেন এবং বিনোদন খাতে ব্যয় সীমিত রাখছেন।
তাঁদের দাবি, পারিবারিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার এবার ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছে কিংবা বাজেট কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে পর্যটন ব্যবসায়।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, “মানুষ আসছে, ঘুরছে, ছবি তুলছে; কিন্তু আগের মতো খরচ করছে না। পর্যটকের উপস্থিতি আর ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যে এখন একটা বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।”
প্রশান্তির খোঁজে সমুদ্রের কাছে
ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ বারবার ছুটে আসে প্রকৃতির কাছে। কুয়াকাটার বিস্তীর্ণ সৈকত, সমুদ্রের গর্জন, ঝাউবনের ছায়া আর নির্মল বাতাস সেই আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমুদ্রের ধারে বসে থাকা মধ্যবয়সী এক পর্যটক বলছিলেন, “আমাদের জীবন এখন শুধু দৌড়ের ওপর চলছে। এখানে এসে মনে হচ্ছে একটু থামতে পেরেছি। সমুদ্র মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।”
ভোর হওয়ার আগ মুহূর্তে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হতে থাকেন পর্যটকেরা। সূর্যের প্রথম আলো যখন বঙ্গোপসাগরের বুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রাত জেগে থাকা অনেকের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক ধরনের তৃপ্তি।
হয়তো এ কারণেই হোটেলের কক্ষ না পাওয়া, সৈকতের বেঞ্চে রাত কাটানো কিংবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট—সবকিছুই ম্লান হয়ে যায় প্রকৃতির বিশালতার সামনে।
ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটা আবারও প্রমাণ করেছে, শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি মানুষের কাছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য আশ্রয়। যেখানে কখনো কখনো একটি নির্ঘুম রাতও হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি।
মন্তব্য করুন