
কেউ ফিরছিলেন প্রিয়জনের কাছে, কেউ বেরিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। কিন্তু অনেকেরই সেই যাত্রা শেষ হয়েছে সড়কেই।
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ছয় দিনের ছুটিতে বগুড়ার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে আটজনই মোটরসাইকেল আরোহী। এছাড়া এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন।
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত জেলার শাজাহানপুর, কাহালু, নন্দীগ্রাম, শেরপুর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় অন্তত আটটি বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছে বাবা-মেয়ে, মা-মেয়ে, বন্ধু, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী এবং একজন প্রধান শিক্ষক।
ঈদযাত্রার শুরুতেই নেমে আসে প্রথম শোক। ২৫ মে সকালে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের শাজাহানপুর উপজেলার বনানী এলাকায় অজ্ঞাত একটি যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণ হারান ব্র্যাককর্মী আনিছুর রহমান ও তার দুই বছরের কন্যা পুষ্প। রংপুর থেকে মোটরসাইকেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে পাবনায় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম।
সেদিনই বিকেলে কাহালু উপজেলার কাজিপাড়া এলাকায় আরেকটি দুর্ঘটনায় নিভে যায় মা-মেয়ের জীবন। একটি যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় রিকশাভ্যানে থাকা জেমি আক্তার ও তার মেয়ে তনু আক্তার নিহত হন। আহত হন ভ্যানচালক।
দুই দিন পর, ২৭ মে, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কাহালু ও নন্দীগ্রামে তিনটি পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরও চারজন। কাহালুর বউবাজার এলাকায় বিকল হয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসকে পেছন থেকে ট্রাক ধাক্কা দিলে নিহত হন বাসের সুপারভাইজার উত্তম মণ্ডল ও ট্রাকের সহকারী হৃদয়। একই উপজেলার ভ্যাপরা এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় মারা যান শ্রমিক রবিউল আউয়াল ওরফে জিয়া। অন্যদিকে নন্দীগ্রামের ফোকপাল এলাকায় দুটি বালুবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ট্রাকের সহকারী ইনজামাম।
ঈদের দিন রাতেও থামেনি মৃত্যুর মিছিল। শেরপুর-ধুনট আঞ্চলিক সড়কের শুভগাছা এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত হন দুই বন্ধু আবু রায়হান ও তামিম হোসেন। আহত হন আরও চারজন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ফাঁকা সড়কে অতিরিক্ত গতিই এ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছিল।
ঈদের পরদিন ২৯ মে সন্ধ্যায় কাহালুর বারোমাইল এলাকায় ঘটে আরও ভয়াবহ একটি দুর্ঘটনা। দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিন বন্ধু – রাহিম, অপূর্ব ও প্রেম। স্থানীয়দের মতে, বৃষ্টিভেজা সড়কে উচ্চগতিতে মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই ঘটে এই দুর্ঘটনা। এতে আহত হন আরও দুজন।
সবশেষ ৩০ মে রাতে শিবগঞ্জ পৌরসভার লালদহ এলাকায় আলুবোঝাই একটি ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন বগুড়া সদর উপজেলার চকহবিবরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক (৫৮)। মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ছয় দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনা যেন একের পর এক পরিবারের ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। কোথাও সন্তান হারিয়েছেন বাবা, কোথাও বাবা হারিয়েছে সন্তানকে, আবার কোথাও বন্ধুরা একসঙ্গে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরতে পারেননি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নিহতদের বড় একটি অংশই মোটরসাইকেল আরোহী এবং তরুণ বয়সী। এ কারণে সড়কে বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ চালনার বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কে কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এ ধরনের দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।
ঈদের আনন্দ শেষে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় এখনও শোকের আবহ বিরাজ করছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ১৪ প্রাণহানির এসব ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও চালকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার উচ্চ হার উদ্বেগ বাড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন